ইন্দোরকে ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর বলা হয়। আট বছর ধরে শহরটি সেই তকমা ধরে রেখেছে। শহরের পথে-ঘাটে আবর্জনা কম দেখা যায়, ডাস্টবিন থাকে সাজানো-গোছানো, জনস্বাস্থ্য নিয়ে নানা প্রচারণা চলে। কিন্তু সেই পরিচ্ছন্নতার আড়ালেই জমে উঠেছিল এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কুণ্ডলী।
গত কয়েক সপ্তাহে সেই কুণ্ডলী বিস্ফোরিত হয়েছে। সুপেয় পানির লাইনে বর্জ্য মিশে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে—অনেকেই একে প্রশাসনিক অবহেলা নয়, বরং সক্রিয় উদাসীনতা বলছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছে শিশু, নারী ও শ্রমজীবী মানুষ। হাসপাতালগুলোতে কিডনি জটিলতা নিয়ে রোগীর ভিড়, চিকিৎসকদের শঙ্কা—সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির দিকে যেতে পারে।
তদন্তে উঠে এসেছে এমন তথ্য, যা শুনেই অনেকে বিস্মিত। ভাগীরথপুরায় একটি পুলিশ চৌকির শৌচাগার সরাসরি মূল পানি সরবরাহের পাইপলাইনের ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল। কোনো সেপটিক ট্যাংক ছিল না, বর্জ্য জমছিল একটি গর্তে। গত মাসে পাইপলাইনে ফাটল ধরলে সেই গর্তের মলমূত্র মিশে যায় পানির লাইনে—আর ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় বিষাক্ত পানি।
ঘটনার পর স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তিন শতাধিক মানুষ ভর্তি হন। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই নারী। চিকিৎসকরা জানান, তাদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের কিডনি অকেজো হওয়ার পথে। একটি ৫ মাস বয়সী শিশুর মৃত্যু এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়—গুঁড়া দুধের সঙ্গে মেশানো দূষিত পানি তিন দিনের মাথায় তার জীবন কেড়ে নেয়।
অভিযোগকারী স্থানীয়দের দাবি—বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব ছিল। অক্টোবরেই পানির গুণমান নিয়ে সতর্কতা আসে। নভেম্বরে অভিযোগ ওঠে পানিতে অ্যাসিডের উপস্থিতি নিয়ে। ১৮ ডিসেম্বর উৎকট গন্ধের কথা নথিভুক্ত হয়। তবুও ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ততদিনে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষ।
নথিপত্রও বিস্ময় বাড়িয়েছে। নতুন পাইপলাইনের নকশা ২০২৪ সালের নভেম্বরে শেষ হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে টেন্ডার। অথচ কাজ শুরুর কার্যাদেশ আসে ২৬ ডিসেম্বর—যখন মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে গেছে।
এই বিপর্যয়ের পেছনে জবাবদিহির প্রশ্ন উঠতেই চাপে পড়েন স্থানীয় বিধায়ক ও মন্ত্রী কৈলাস বিজয়বর্গী। সাংবাদিক অনুরাগ দ্বারী জনমৃত্যু ও স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে প্রশ্ন করেন। কিন্তু মন্ত্রী প্রশ্নটিকে ‘ফালতু’ বলে উড়িয়ে দেন এবং সাংবাদিককে অপমান করে বলেন—‘তুমি কি ঘণ্টার খবর নিয়ে এসেছ?’
ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই ইন্দোরের রাস্তায় দেখা যায় অভিনব প্রতিবাদ—মানুষ হাতে ঘণ্টা নিয়ে নেমেছে। কেউ ছোট ঘণ্টা, কেউ স্কুলের ঘণ্টা, কেউ মন্দিরের ঘণ্টা—সবই যেন একটাই বার্তা দেয়:
“প্রশ্নকে ঘণ্টা বলে উড়িয়ে দিলে, শহর ঘণ্টা বাজিয়ে জবাব দেবে।”
ইন্টারনেটে এর নাম হয়ে যায়—‘বেইল প্রোটেস্ট’।
বিপর্যয়ের পর সরকার প্রশাসনিক স্তরে দায় কাটানোর চেষ্টা করেছে। মিউনিসিপ্যাল কমিশনার, অ্যাডিশনাল কমিশনার ও সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—২৬ বছর ধরে একই এলাকা থেকে নির্বাচিত হওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় কোথায়?
সচেতন মহল বলছে—উন্নত দেশে এ ধরনের বিপর্যয়ের পর শুধু স্থানীয় বিধায়ক নয়, মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত পদত্যাগ করতেন। ইন্দোরে পরিচ্ছন্নতার পদক দেখানো হয়, কিন্তু মানুষের জীবন কি সেই পদকের পেছনে পড়ে থাকে?
এ প্রতিবাদ শুধু অপমানের জবাব নয়; এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতার বোঝাপড়া। পরিচ্ছন্নতার প্রতীকী শহরকে অপবাহিত পানির সঙ্গে জর্জরিত হতে দেখে মানুষ বুঝেছে—বাহ্যিক সৌন্দর্য রাষ্ট্রের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ঢেকে রাখে না।
ইন্দোরে এখন প্রশ্ন—
পদক দিয়ে কী হবে, যদি পানি পান করলেই মৃত্যু আসে?
পরিচ্ছন্নতার সার্টিফিকেট কি জীবনের ওজনের চেয়ে বড়?
আর ক্ষমতা কি প্রশ্নকে ‘ঘণ্টা’ বলে উড়িয়ে দিতে পারে?
বিপর্যয় এখনও শেষ হয়নি। সংক্রমণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা যাচ্ছে। জবাবদিহি এখনও অসম্পূর্ণ। কিন্তু ঘণ্টা বাজিয়ে ইন্দোরের মানুষ বলেছে—ঘটনা চাপা পড়বে না, প্রশ্নটাও বাজতে থাকবে।