মারুফ আহমেদ
এলপিজি সিলিন্ডারকে ঘিরে রাজধানীতে যে অসংযত উত্তাপ তৈরি হয়েছে—তা শুধু বাজারের নয়, নীতিনির্ধারক ও ভোক্তা উভয়ের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। দামবৃদ্ধির এই নাটকের মূল চরিত্র—ডিলার, রিটেইলার, মজুদকারী চক্র ও তথাকথিত ‘সিন্ডিকেট’। আর দর্শক—রাষ্ট্রীয় দুই পক্ষ: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। দর্শক থাকা বা অদৃশ্য থাকা—দু’ক্ষেত্রেই ভোগান্তির দায় ভোক্তার গায়ে পড়ছে।
অভিযোগে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে—ক্যাশ মেমো না দেওয়া, মূল্য তালিকা না রাখা, সরকারি দামের কথা বললে দোকানি–ডিলারের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। অনেক দোকানিই সরাসরি বলেছেন—“নিলে নেন, না নিলে কেটে পড়েন।” যারা হটলাইন ১৬১২১ এ ফোন করেছেন—তাদের বড় অংশ সাহায্য পাননি বলে দাবি করেছেন।
ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম আগে নির্ধারিত ছিল ১২৫৩ টাকা। কিন্তু বাস্তব বাজারে দাম ১৩৫০ থেকে ২৪০০—আরও চরম পরিস্থিতিতে ৩৫০০ টাকাও। এতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রতি সিলিন্ডারে ১০০০–২২০০ টাকা পর্যন্ত। ঢাকার প্রায় সব ব্যবহারকারীই গড়ে কমপক্ষে ১৫০০ টাকা অতিরিক্ত দিয়েছেন—শুধু ডিসেম্বর–জানুয়ারির এই সংকট সময়ে।
কেন দাম বাড়ল—এ প্রশ্নে ডিলার–রিটেইলাররা ব্যাখ্যা দেননি। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাও তথ্য প্রকাশে কৃপণ থেকেছে।
বিশ্ববাজারে বিগত মাসগুলোতে এলপিজির বড় মাপের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—দাম বৃদ্ধির যুক্তি কি বিশ্ববাজার–না কি অভ্যন্তরীণ মজুদকারীদের কৌশল?
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন—“লিটারপ্রতি ৫৭ টাকা ধরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১২৬৫ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।” কিন্তু বাজারে এ দামকে দ্বিগুণ করে বিক্রি হয়েছে।
ক্রাতারা বলেন—ভোক্তা অধিকার মাঠে নামার আগেই মজুদকারীরা সিলিন্ডার সরিয়ে ফেলার সুযোগ পায়। এটিকে অনেকেই বলেন—প্রি-সিন্ডিকেশন। অর্থাৎ আগাম সংকট তৈরি করে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়ানো। দোকানে সিলিন্ডার অল্প রেখে ‘হাহাকার’ দেখানো হয়—ফলে দাম নিয়ে দর কষাকষির জায়গা থাকে না।
ভোক্তা অধিকার মাঠে নেমেছে—তবে বড় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই। সিন্ডিকেট ভাঙা—বা বড় ডিলারশিপ বাতিল—এরকম উদাহরণ নেই। ফলে দেখার মতো হয়েছে—রাষ্ট্র আছে, কিন্তু প্রভাবহীন; আইন আছে, কিন্তু দন্তহীন।
অতিরিক্ত দাম দিতে না পেরে বহু পরিবার এলপিজি থেকে সরে গেছে। মাটির চুলা, ইন্ডাকশন, ইনফারেড, ডিজেল স্টোভ, রাইসকুকার—বিকল্প প্রযুক্তির বাজারে বিপুল ভিড় দেখা গেছে। বিকল্প বাজারের এই বিকাশ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ভোক্তার নীরব প্রতিরোধ। প্রশ্ন উঠছে—এত বিনিয়োগের পর লোকেরা কি আবার এলপিজিতে ফিরবে? সিলিন্ডার কোম্পানিগুলো যে হারে নিয়মিত ক্রেতা হারাবে—তা এখনই বোঝা যাচ্ছে।
এই সংকটের তিনজন মূল অভিনেতা চিহ্নিত:
-
বৃহৎ ডিলার
-
মজুদকারীরা
-
রিটেইলার
এরা কাঠামোগতভাবে পরস্পর সংযুক্ত—সর্বোচ্চ লাভে ভোক্তা সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ।
অনেকে বলছেন—টিসিবির অন্যান্য পন্য বিক্রির মতো সরকারি ন্যায্যমূল্যে সিলিন্ডার সরাসরি বিক্রি করা হলে সিন্ডিকেটের প্রভাব কমবে। অন্যরা বলছেন—ডিলারশিপ ও পরিবেশনা নীতি সংস্কার করলে স্বচ্ছতা বাড়বে।