এনপিএ-র যাত্রা: সেন্টার-লেফট ফিরে এলো কি এনপিএর মাধ্যমে?

ইথান হক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্দিষ্ট শূন্যতা অনুভূত হচ্ছিল। একদিকে প্রথাগত ডানপন্থা আর অন্যদিকে পুরনো ঘরানার বামপন্থা—এই দুই মেরুর বাইরে ‘সেন্টার-লেফট’ বা মধ্য-বামপন্থী একটি আধুনিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। সেই শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করেছে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ এনপিএ (Network for People’s Action)। তাদের এই আত্মপ্রকাশ নেটিজেন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এনপিএ-র শুভাকাঙ্ক্ষীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, দলটিকে শুরুতেই ‘স্টাডি সার্কেল’ বা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বামপন্থী দলগুলোর একটি পুরনো রোগ হলো তারা জনসম্পৃক্ততার চেয়ে অ্যাকাডেমিক চর্চায় বেশি সময় ব্যয় করে। এনপিএ-র জন্য পরামর্শ হলো—একটি দক্ষ এবং যোগ্যতাভিত্তিক (Competence-based) হায়ারার্কি বা স্তরবিন্যাস তৈরি করা। রাজনীতিতে সব ধরনের মানুষের প্রয়োজন আছে; কেবল বুদ্ধিজীবী নয়, বরং মাঠপর্যায়ের উদ্যমী কর্মী এবং ব্যবসায়ী-পেশাজীবীদেরও দলে ভেড়াতে হবে।

বর্তমান ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের নেতৃত্বের চেহারার ওপর। নেটিজেনদের মতে, এনপিএ-র এমন কিছু ‘ফেইস’ প্রয়োজন যারা একইসঙ্গে সিরিয়াস, চৌকস এবং সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয়। তারা যেন কোনোভাবেই ‘জোকার’ হিসেবে উপস্থাপিত না হন। পাশাপাশি, কেবল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল তরুণ সমাজকেও এই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে হবে।

এনপিএ-র প্রতি সমালোচকদের সবচেয়ে বড় পরামর্শ হলো—প্রথাগত বামপন্থী ‘শোষণ-বঞ্চনা’র শব্দভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে আসা। “অর্থনৈতিক মুক্তি”র মতো ক্লিশে শব্দের বদলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আগামী কয়েক দশকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার মতো বাস্তবসম্মত ও আধুনিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পুঁজির বিলোপ নয়, বরং পুঁজি কীভাবে সম্পদ তৈরি করে এবং সেই সম্পদ কীভাবে জনকল্যাণে বণ্টিত হয় (Social Democracy), সেই আধুনিক পুঁজিবাদী কল্যাণমুখী ব্যবস্থার ধারণা দিতে হবে।

এনপিএ-র ৫টি মূলনীতির মধ্যে ‘প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা’ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছে। অনেকে একে ‘আই-সুদিং’ বা প্রশান্তিদায়ক হিসেবে দেখছেন। বিশ শতকের রাজনীতি যদি হয় ক্ষুধা মুক্তির, তবে একুশ শতকের রাজনীতি হবে ক্লাইমেট বা জলবায়ুর। অস্ট্রেলিয়ার ‘গ্রিনস পার্টি’র উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, এনপিএ যদি পরিবেশ ও প্রাণপ্রকৃতি নিয়ে সঠিক অ্যাডভোকেসি করতে পারে, তবে তারাই হবে তরুণ প্রজন্মের কাছে আগামীর ‘কুলডুড’ পার্টি।

দলটির ঘোষণাপত্রে ‘বাংলাদেশপন্থী’ এবং ‘বিউপনিবেশায়ন’ এর মতো শব্দগুলোর গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ, টেকনোলজি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে—তা পরিষ্কার করা জরুরি। এছাড়া দলের নামে ‘নেটওয়ার্ক’ শব্দটির ব্যবহার এনজিও কালচারের দিকে ইঙ্গিত করে কি না, সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। এমনকি দলের লোগো বা প্রচারণায় বামপন্থার চিরচেনা ‘লাল’ রঙের অনুপস্থিতিও আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।

এনপিএ একটি সম্ভাবনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। ১০১ জন উদ্যমী তরুণের এই প্রয়াস ১০১ লাখ তরুণের প্রাণে স্পন্দন জোগাবে কি না, তা নির্ভর করবে তাদের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর। তাদের লক্ষ্য কেবল মানববন্ধন বা সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সংসদমুখী হওয়া উচিত। শোষণের সাগর সেচ করা নয়, বরং উত্তাল সাগরে আধুনিক জাহাজ তৈরি করে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই হোক এনপিএ-র আগামীর রাজনীতি।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *