মারুফ আহমেদ
আগুনের ভয়াবহতার কথা বাংলাদেশে নতুন নয়। শুক্রবার, (১৬ই জানুয়ারি) রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক ভবনে আগুনে দুই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনও মানুষের মনকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। বারান্দায় আটকে থাকা মানুষের আর্তনাদ, হাত নেড়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা—সবকিছুই নজরে পড়েছে। স্বপ্নময় জীবনের সমাপ্তি ঘটে গেল আগুনের ভয়াবহতার কাছে।
দেশে বড় কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটলেই রাজউকের নাম উঠে আসে। ভবন নির্মাণ, ডেভেলপার কোম্পানির নীতিমালা, বিল্ডিং কোড—এসব নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তারপর সব ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। নতুন করে উঠে আসে অনিয়মের তথ্য, কিন্তু সুরাহা হয় না।
ঘটনার সময় অপেক্ষমাণ প্রতিবেশীরা ক্ষোভ নিয়ে বলছিলেন, সবাই যদি ছাদে যেতে পারত, তবে হয়তো বাঁচা যেত। অনেকে বলছেন, কারও বাসায় সেফটি ডোর আছে, কারও লিফটের পাশে পেছন দিকে সিঁড়ি, কোথাও ফায়ার এক্সিট বা এক্সটিংগুইশার। প্রশ্ন হলো—রাজধানীর কয়টি বহুতল ভবন নিয়ম মেনে তৈরী করা?
রাজউক বহুতল ভবনের প্ল্যান পাসের সময় বিভিন্ন নীতিমালা ঠিক করে দেয়। তবু আগুনের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন আছে। ভূমিকম্পের মতো আগুনকেও পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরি জরুরি।
আরেক বাস্তব সমস্যা হলো ছাদে ওঠার অনুমতি। শহরের বহু বাড়িওয়ালা নিরাপত্তা, ছাদবাগান বা ব্যক্তিগত কারণে ছাদের গেট তালা দিয়ে রাখেন। প্রশ্ন ওঠে—সব ভাড়াটিয়া কি ছাদের চাবি পায়? কিন্তু ঘটনার মূল জায়গা তালাচাবির বাইরে—বেশিরভাগ ফ্ল্যাট মালিক বা মালিক সমিতিই আগুন লাগলে কী করতে হবে সেই ধারণাই নাই। সচেতনতা নেই।
গ্যাসসংকটের কারণে শহরের বড় অংশ এখন এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে। সিলিন্ডারের ঝুঁকি নিয়ে বাসাবাড়িতে আলোচনা হয় না বললেই চলে। আগুনে শুধু মানুষ পুড়েই মারা যায় না—ধোঁয়ায় শ্বাসরোধেও মৃত্যু হয়, যা অনেকেই জানে না।
অপ্রতুল ও অপরিকল্পিত নগরায়নে ছাদবাগান করে শাকসবজি খাওয়ার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আগুন লাগলে কোথা দিয়ে মানুষ বের হবে। প্রযুক্তিনির্ভর অগ্নিনির্বাপণের দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে। বহুতল ভবনে গ্রিল কাটা, উচ্চতায় উদ্ধার, অক্সিজেন মাস্ক, জীবনরক্ষাকারী সুরক্ষা সরঞ্জাম—কিছুই কার্যকর নয়। ফায়ারফাইটারদের সাহস আছে, কিন্তু প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ এখনো মান্ধাতা আমলের।
উন্নত বিশ্বের বড় বড় দালানে আগুন লাগে, তবু মৃত্যু এত বেশি নয়। এখানে আগুন নেভানো কঠিন, উদ্ধার আরও কঠিন। গতকাল উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ৬তলা ভবনের আকস্মিক আগুন এই দৈন্যতা সামনে এনে দিয়েছে।
এখনই প্রয়োজন বাসাবাড়ি, বহুতল দালান, স্কুল, কলেজ, উপাসনালয়, রেস্টুরেন্ট, শপিংমলসহ সব স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে মানুষকে সচেতন করা। শুধু ফায়ার এক্সিট, এক্সটিংগুইশার বাধ্যতামূলক হলেই হবে না—সরকারি নজরদারি ও চেকিং সিস্টেম আনতে হবে। প্রতিটি বাসায় বারান্দার গ্রিলে ছোট ‘এক্সিট গেট’ সংযুক্ত রাখা উচিত—এটি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
২০২৫ সালের শুরুতে নারায়ণগঞ্জে একই পরিবারের পাঁচজন রেল দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। বছর শুরুর আরেক মর্মান্তিক ঘটনায় এবার একই পরিবারের ছয়জন আগুন ও ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে মারা গেল। এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি পরিবারের নয়—পুরো নগরের অসহায়তার প্রতিচ্ছবি।
লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক