মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার আলোচনায়। তিনি গ্রিনল্যান্ড কিনতে চান—প্রয়োজনে জোর করে। আর এর আড়ালে তার কিছু সাবেক সহকর্মী গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে নানা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করছে।
ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সাবেক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা জর্জ সোরিয়াল এবং সাবেক নিরাপত্তা পরিচালক কিথ শিলার সেই দলে আছেন। শিলার ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস পরিচালনা করতেন। দুজনেরই আগ্রহ একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে—গ্রিনমেট।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গ্রিনমেট জানায় যে তারা ট্যানব্রিজ মাইনিং গ্রিনল্যান্ড এ/এস-এর সাথে এক কৌশলগত চুক্তিতে পৌঁছেছে। ট্যানব্রিজের কাছে বিরল খনিজ আহরণের লাইসেন্স আছে। গ্রিনমেট ট্যানব্রিজকে বলেছে—“গ্রিনল্যান্ডের একমাত্র প্রস্তুতপ্রাণ বিরল খনিজ প্রকল্প।”
গ্রিনমেটের বাণিজ্যিক নাম গ্রিনটেক মিনারেলস হোল্ডিংস ইনক। ওয়াশিংটন ডিসির করপোরেট নিবন্ধনে দেখা যায়, সোরিয়াল ও শিলার সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকদের তালিকায় আছেন। তাদের সাথে আছেন সিইও ড্রু হর্ন। হর্ন একসময় মাইক পেন্সের সহকারী ছিলেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাও ছিলেন।
গ্রিনল্যান্ডে নিজের ব্যবসায়িক আগ্রহ হর্ন লুকাননি। তবে সোরিয়াল ও শিলারের ভূমিকা সাধারণ মানুষ খুব কমই জানে।
সোরিয়াল OCCRP-কে বলেন—তিনি ও শিলার “গ্রিনমেট বা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সক্রিয় নন।” তার ভাষায়—“আমরা কেবল ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার। কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় আমাদের কোনো ভূমিকা নেই।”
সোরিয়াল, শিলার ও হর্ন ছাড়াও সাংবাদিকরা ট্রাম্প-সংলগ্ন আরও দুজনকে খুঁজে পেয়েছেন, যারা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ব্যবসায়িক আগ্রহ দেখিয়েছেন। এবং সাম্প্রতিক সময়ে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পদেও নিয়োগ পেয়েছেন।
এ নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে বলে মন্তব্য করেন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত নরম্যান আইজেন, যিনি ডেমোক্রেসি ডিফেন্ডার্স ফান্ড নামে দুর্নীতি ও গণতন্ত্রবিরোধী প্রবণতা রোধে কাজ করা এক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তার কথায়—“ট্রাম্পের বেআইনি গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা অন্যায্যই ছিল। কিন্তু তার সহযোগীদের ব্যবসা থেকে লাভবান হওয়ার অভিযোগ বিষয়টিকে আরও খারাপ করেছে।”
গ্রিনমেট ও অন্যান্যদের এই ব্যবসায়িক দৌড় চলছে এমন এক সময়ে—যখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে ব্যস্ত, অথচ দ্বীপটির ৫৭ হাজার মানুষ ও এর প্রশাসক ডেনমার্ক এই ধারণাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের নেতারা বলছেন—এটা তারা চান না।
তবে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের তাতে থামতে দেখা যাচ্ছে না।
জানুয়ারি ১৪ তারিখে ড্রু হর্ন “ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস” অনুষ্ঠানে বলেন—গ্রিনল্যান্ডবাসী “ড্যানিশ শোষণে ক্লান্ত,” এবং “উপনিবেশের যুগ শেষ”—এ কথা বলতেও বাদ রাখেননি।
গ্রিনমেটের সাথে যুক্ত ছিলেন ভূতাত্ত্বিক নেড মামুলা। তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভের পরিচালক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কংগ্রেসের এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিকে “খনিজসম্পদ গবেষণার প্রধান ফেডারেল বিজ্ঞান সংস্থা” বলা হয়।
মামুলা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জ্বালানী মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছিলেন। তার লিঙ্কডইন বলছে—তিনি একসময় সিআইএ বিশ্লেষকও ছিলেন। গ্রিনমেটের ওয়েবসাইটে এখনও তাকে পরামর্শক হিসেবে দেখানো হলেও, তিনি সম্প্রতি জানিয়ে দিয়েছেন— তিনি তার শেয়ার বিক্রি করেছেন। ২০২৪ সালে মামুলা “আন্ডারমাইনিং পাওয়ার” নামে একটি বই লেখেন। ভূমিকা লেখেন ড্রু হর্ন। বইতে তারা বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখার পক্ষে মত দেন।
গ্রিনল্যান্ডে বিরল মাটির খনিজ আছে—যা ইলেকট্রনিকস, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানিতে লাগে। এ কারণ দেখিয়ে ট্রাম্পও গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের যুক্তি দাঁড় করান। তিনি বলেন—এটা ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের মার্চে কংগ্রেসে ট্রাম্প বলেন—“একভাবে কিংবা অন্যভাবে, আমরা এটা নেবই।”
২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি, বাবার শপথগ্রহণের কিছুদিন আগে, ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র গ্রিনল্যান্ডে যান ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের বিমানে। তার পরপরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যান গ্রিনল্যান্ডে—সেখানে গিয়ে স্থানীয়দের বলেন, ডেনমার্কের সাথে সম্পর্ক কমাতে। এই সফরগুলোর পেছনে ছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা থমাস ড্যান্স। তিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ট্রেজারি বিভাগে কাজ করতেন।ড্যান্সের রয়েছে আমেরিকান ডেব্রেক নামে এক প্রতিষ্ঠান, যা তিনি ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের আগে ‘করমুক্ত সংস্থা’ হিসেবে নিবন্ধন করান। তিনি ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে লেখেন—“আমেরিকান ডেব্রেক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-গ্রিনল্যান্ড সম্পর্ক শক্ত করার চেষ্টা করেছে…।”
অলাভজনক আর্কটিক টুডে লেখে—ড্যান্স ট্রাম্পের প্রথম দফা দায়িত্ব শেষে বরফ ভাঙা জাহাজ প্রকল্পে কাজ করেছিলেন।
২০২৪ সালের হিসাবপত্রে ডেব্রেক জানায়—তাদের আয় ১ লক্ষ ৬০ হাজার ডলার। দাতাদের নাম নেই। তাদের প্রতিবেদনে লেখা—তারা আমেরিকানদের “গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও যুক্তরাষ্ট্র-গ্রিনল্যান্ড সম্পর্ক” বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছে।
ড্যান্স প্রশ্নের জবাব দেননি। সংগঠনের কাজ কী—এ নিয়েও কিছু জানাননি।
গত মাসে ট্রাম্প ড্যান্সকে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক রিসার্চ কমিশনের প্রধান করেন—যেখানে সাধারণত শিক্ষাবিদরা থাকেন।
গ্রিনমেটের শেয়ারহোল্ডার সোরিয়াল ২০০২ থেকে ট্রাম্প প্রথম দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত সরাসরি তার জন্য কাজ করেন। ২০১৯ সালে তিনি ট্রাম্পকে নিয়ে ‘দ্য রিয়েল ডিল’ নামে প্রশংসামূলক বই লেখেন।
২০১৯ সালে তিনি ট্রাম্প অর্গানাইজেশন ছাড়েন। তার বইতে আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে ট্রাম্পের গলফ রিসোর্ট প্রকল্পের কথা আছে। নথিতে দেখা যায়, সোরিয়াল সেসব প্রতিষ্ঠানের বোর্ডেও ছিলেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে—ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার এক মাস আগে—সোরিয়াল ও শিলার গঠন করেন জ্যাভেলিন অ্যাডভাইজর্স এলএলসি নামে এক লবিং ফার্ম। নিজেদের পরিচয় দেন ‘ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা’ হিসেবে এবং ওয়েবসাইটে লেখা—“ভিতরের লোকের সৃষ্টি। প্রবেশের সুযোগই শক্তি।”
জ্যাভেলিনের গ্রিনল্যান্ডে সরাসরি কোনো কাজ নেই, তবে তারা বিরল খনিজ নিয়ে কাজ করেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের নথিতে দেখা যায়—পাকিস্তান সরকার তাদের দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরল খনিজ চুক্তির বিষয় নিয়ে লবিং করিয়েছে।
এদিকে সোরিয়াল ও শিলারের গ্রিনমেটের শেয়ার থেকে গেছে—যেখানে গ্রিনল্যান্ডের ট্যানব্রিজ প্রকল্প নিয়ে আগ্রহ আছে।
হর্ন বলেন—“তারা ২০২৫ সালের শুরুতে বোর্ড ও পরামর্শকের ভূমিকা ছেড়েছেন। এখন কেবল নিষ্ক্রিয় শেয়ারহোল্ডার।”
গ্রিনমেট জানায়—তাদের সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলছে।
২০২৫ সালের জুনে গ্রিনমেট জানায়—তারা ট্যানব্রিজের বিনিয়োগকারী ক্রিটিক্যাল মেটালস কর্প-কে সহায়তা করেছে গ্রিনল্যান্ড প্রকল্পে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে ১২০ কোটি ডলারের অর্থসহায়তার আগ্রহপত্রও পেয়েছে।
ব্লুমবার্গ লিখেছে—হর্ন নিজে ট্রাম্পদের কাছে প্রকল্পের ছবি দেখিয়ে ব্রিফ করেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্রিটিক্যাল মেটালস প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে ট্যানব্রিজ ২০০০-এর দশক থেকেই খনি অধিকার নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
এদিকে ট্রাম্প ডিসেম্বর মাসে লুইজিয়ানার গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে বিশেষ দূত করে গ্রিনল্যান্ডে নিয়োগ দেন। ল্যান্ড্রির গ্রিনল্যান্ডের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না। ২০২৩ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র তার নির্বাচনী প্রচারেও যান।
এ নিয়োগের এক সপ্তাহ আগে লুইজিয়ানায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের খনিজ পরিশোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। কোথা থেকে খনিজ আসবে—ঘোষণায় বলা হয়নি। প্রকল্পে যুক্ত কোম্পানি এলিমেন্টইউএসএ প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাথেও কাজ করে।
সূত্র : OCCRP