বিজয় মজুমদার
আফসানা বেগমকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সংবাদ আমাকে বিস্মিত করেছে। তাঁকে অপসারণের কারণ কোথাও খুঁজে পেলাম না। সরকারের তরফ থেকেও কোনও ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি। তাহলে ধরে নেওয়া যায়, এটি একতরফা সিদ্ধান্ত। কারও মনে হয়েছে আফসানা বেগমকে আর প্রয়োজন নেই—তাই সরানো হলো। যদি তাঁর কোনও দোষ বা ব্যর্থতা থাকত, কিংবা অসততা প্রমাণিত হতো, সিদ্ধান্তটি আংশিক হলেও যৌক্তিক মনে হতো।
বাস্তবে এ রকম অজস্র মানুষ অন্যায়ের শিকার হন। তাঁদের অধিকাংশের পক্ষে কেউ লেখেন না। তবু আফসানা বেগমকে নিয়ে লেখা প্রয়োজন মনে করি—কারণ তিনি আমার পরিচিত। ছোটবেলা থেকে তাঁকে চিনি।
তাঁর একটি ‘সমস্যা’ ছিল—উচ্চতা। বিষয়টি শুনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যখন প্রথম দেখি, তখনই লম্বায় আমাদের অনেককেই ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। একটি মেয়ে এত লম্বা, আবার সুন্দরী—বেশির ভাগের চোখে সেটা যেন অস্বস্তিকর ছিল। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল গান গাওয়ার অদ্ভুত মাধুর্য। শুধু তাই নয়, পড়াশোনাতেও ছিল তাঁর উজ্জ্বলতা। স্কুলে ছিলেন সেরা ছাত্রী। এসএসসি-তে স্ট্যান্ড করেছিলেন। পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। মোদ্দা কথা—যে কাজে হাত দিয়েছেন, তা অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে লেখক, অনুবাদক ও কলামিস্ট হিসেবেও তিনি নিজের কাজকে সেই উচ্চতাতেই ধরে রেখেছেন। তাঁর প্রতিটি কাজে ছিল সততা, যত্ন আর এক ধরনের উৎকর্ষতার ছাপ।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক করা হয়। আফসানা বেগম দায়িত্বটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। লাইব্রেরির তাকভর্তি ধুলা কিংবা বহুদিন না উল্টানো বইয়ের পাতার ময়লা—তিনি নিজের শাড়ির আঁচলে মুছে দিতেন। রাজধানীতে বসে বেতন নেওয়ার বদলে তিনি মফস্বলের সরকারি লাইব্রেরি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা পাঠাগারগুলোয় পৌঁছে যেতেন। কীভাবে পাঠককে আবার পাঠাগারমুখী করা যায়—শুধু চিন্তা নয়, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজও করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে পাঠকের হাতে বই তুলে দিতেন। বই পড়ায় উৎসাহিত করার জন্য নেন বেশ কিছু উদ্যোগ।
এ রকম একটি উদ্যোগে আফসানা বেগম তাঁর শৈশবের শহর দিনাজপুরে আসেন। দীর্ঘদিন পর একটি মফস্বল শহরের পাঠকেরা যেন জেগে ওঠে তাঁর আগমনে। দিনাজপুরের সেইন্ট ফিলিপস স্কুল, গার্লস স্কুল ও দিনাজপুর সরকারি কলেজে পাঠকেরা তাঁর হাতে বই পেয়েছিল। সরকারি লাইব্রেরিতে হয়েছিল বই নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, যার সভাপতিত্ব করেছিলেন কবি মাসুদ মুস্তাফিজ। তাঁর উদ্যোগে যাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হয়েছিল, তাদের বলা হয়েছিল বইটি পড়ে একটি ছোট পরীক্ষা দিতে—পুরস্কার নয়, পাঠ নিশ্চিত করার জন্যই ছিল সেই আয়োজন।
তাই প্রশ্ন ওঠে—আফসানা বেগমকে অসম্মানজনক ভাবে সরিয়ে দেওয়ার কারণ কী? উত্তরটি হয়তো সহজ—আফসানা বেগমের ‘উচ্চতা’। অর্থাৎ যে নিষ্ঠা ও সততা নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন, তা এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না। এখানে টিকে থাকে তারা, যারা মাথা উঁচু করে নয়, বরং সিস্টেমের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলতে পারে।
এই দেশে সৎ থেকে মাথা উঁচু করে চলার মূল্য তিনি চুকালেন—এটাই কাহিনীর প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে তাঁর চরিত্র হননের মধ্য দিয়ে। যারা তাঁকে সরালেন, তারা এবার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণে সম্মিলিতভাবে তাঁকে আক্রমণ করবেন—এটাই নিয়ম।
আফসানা বেগম দেশ নিয়ে ভাবতেন। তাঁর উদ্যোগ কারও না কারও স্বার্থে আঘাত করেছে। তাই তাঁর বিদায় ছিল অনিবার্য—তবে এমন অসম্মানজনক নয়। আফসানা বেগমের বিদায়ে কার লাভ আর কার ক্ষতি—সেটি আমার চিন্তার বিষয় নয়। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সৎ মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়, নিষ্ক্রিয় করে দেয়, অথবা বিদায় জানায়—তাহলে আমাদের মাথা থেকেও বিদায় করে দিতে হবে সৎ রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নটা।