জাকির হোসেন
শহরটা টাঙ্গাইল। এখানে নদী আছে, খাল আছে, আবার সেই নদী দখল করে অট্টালিকা বানানোর মানুষও আছে। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এই শহরে নূর মোহাম্মদ রাজ্যের মতো একজন মানুষ আছেন। তিনি কোনো জাদুকর নন, কিন্তু তার কাজের ভেতর এক ধরণের ম্যাজিক আছে। সেই ম্যাজিকের নাম—পরোপকার।
গল্পটা শুরু হয়েছিল রতন সিদ্দিকী নামের এক গুণী মানুষকে দিয়ে। তিনি দৈনিক লোককথার সম্পাদক। ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটি নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে নদী উদ্ধারে নেমেছিলেন। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ময়লা পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু সমাজ বড় অদ্ভুত জায়গা! ভালো কাজে বাধা দেওয়ার মানুষের অভাব নেই। একসময় তিনি ক্লান্ত হলেন, অনেকটা অভিমানেই নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে হাল ধরলেন প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ রাজ্য।
নূর মোহাম্মদ রাজ্য বুঝতে পেরেছিলেন, একলা চলো নীতিতে নদী বাঁচানো যায় না। তাই তিনি পাশে পেলেন টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হামিদুল হক মোহনকে। তারা মিলে গড়ে তুললেন ‘নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি’। সাথে ছিলেন সাংবাদিক রাশেদ মেনন সহ আরো অনেকে।
মানুষ মরণশীল। হামিদুল হক মোহনের আকস্মিক মৃত্যুতে সংগঠনটি থমকে যেতে পারতো। কিন্তু কাজের ধারাটা রয়ে গেল প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক রাজ্যের কাছেই। মানুষের ভালোবাসা নিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন।
তার কোনো মোহ নেই। টাকা-পয়সার প্রতি এক ধরণের উদাসীনতা আছে তার। অথচ কাজের প্রতি মমতা অগাধ। তাকে দেখা যায় সদর হাসপাতালের ময়লা পরিষ্কার করতে, কখনো বা শহরের ড্রেন পরিষ্কারে নেতৃত্ব দিতে। টাঙ্গাইলের সুশীল সমাজ অবাক হয়ে দেখে, একজন মানুষ কীভাবে দিন-রাত এক করে নাগরিক অধিকারের কথা বলে বেড়ান।
নদী দখলদারদের কাছে তিনি এখন এক আতঙ্কের নাম। প্রশাসন আর সংশ্লিষ্ট নানা বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে তিনি যে তৎপরতা চালাচ্ছেন, তাতে অনেক রাঘববোয়ালই এখন নড়েচড়ে বসেছেন।
ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। এক বিধবা মহিলার জমি তার পরিবারের লোকজন দখল করে নিয়েছিল। কান্নাকাটি ছাড়া সেই মহিলার আর কোনো গতি ছিল না। খবরটি রাজ্যের কানে পৌঁছাতেই তিনি বিষয়টিকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। কোনো হইচই নেই—খুব শান্ত মাথায় তিনি সমস্যার সমাধান করে দিলেন। সেই বিধবা মহিলার চোখে এখন আর জল নেই, আছে রাজ্যের জন্য দোয়া। টাঙ্গাইলের প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি নাগরিকের অধিকারে তিনি এখন এক ভরসার নাম।
নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি এগিয়ে চলুক। নূর মোহাম্মদ রাজ্যের মতো নিঃস্বার্থ মানুষেরা বেঁচে থাকুক। কারণ দিনশেষে এরাই প্রমাণ করে, পৃথিবীটা এখনো পুরোপুরি পচে যায়নি।