বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি ৯ই ফেব্রুয়ারি

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে বড় একটি অগ্রগতি হতে যাচ্ছে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ‘পাল্টা শুল্ক’ কমানো এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে এদিন একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা ও ওয়াশিংটন।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরের অনুমোদন চেয়ে সারসংক্ষেপ (সামারি) পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রথমে ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণা করলেও আলোচনার সুযোগ রেখেছিল। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষে গত ৩১ জুলাই সেই শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিতে হয় বাংলাদেশকে।

শুল্ক আরও কমবে কি না— এমন প্রশ্নে বাণিজ্য সচিব বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ২০ শতাংশ। অন্যান্য অনেক দেশেও একই বা তার চেয়ে বেশি শুল্ক আছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও ৯ ফেব্রুয়ারির আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

এই সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে— যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি। বাণিজ্য সচিব জানান, দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সাধারণত এক দেশের উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘কিউমুলেশন বেনিফিট’ পাওয়া যায়। এই সুবিধার লক্ষ্যেই এমন চুক্তি করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করা পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার।

চুক্তির আওতায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বাণিজ্য সচিব বলেন, বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা আগেও ছিল। এখন সেটি একটি কাঠামোগত রূপ পেয়েছে। কতটি বিমান, কোন বছর সরবরাহ, দাম ও কনফিগারেশন— এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এই চুক্তিতে কোনো যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত নয় বলে স্পষ্ট করেন তিনি।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি তেল, এলএনজি, গম, ভোজ্যতেল, বেসামরিক উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও তুলা আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। জানা গেছে, আগামী এক থেকে দেড় বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। কয়েক বছরে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

সম্প্রতি ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর নিয়ে সরকারের উদ্বেগ আছে কি না— এমন প্রশ্নে বাণিজ্য সচিব বলেন, উদ্বেগের কিছু নেই। বাংলাদেশ গত ৪৫ বছরে তৈরি পোশাক খাতে বড় সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। ভারত বেসিক টেক্সটাইলে শক্তিশালী হলেও দুই দেশ এখনো পরিপূরক অবস্থায় আছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য শুল্ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ একাধিক দেশের সঙ্গে এফটিএ করছে বলেও জানান তিনি। জাপানের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা শেষ হয়েছে এবং আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি তা স্বাক্ষরিত হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য বাজারেও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

গত ছয় মাসে রপ্তানিতে ৩.৭ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, বিশ্ববাণিজ্যেই মন্দা চলছে। বৈশ্বিক গড় যেখানে ৩.৭ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১.৬ শতাংশ— যা তুলনামূলকভাবে ভালো।

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছর পরিস্থিতি সন্তোষজনক থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ৯ ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি শুল্ক কমানো, পোশাক রপ্তানিতে নতুন সুবিধা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *