সদরঘাট লঞ্চঘাটে ইজারার নামে চাঁদাবাজি 

ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ইজারার নামে চলছে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। লঞ্চে ওঠার সময় যাত্রীদের বড় ব্যাগ দেখলেই কিছু ব্যক্তি নিজেদের ‘ঘাট ইজারাদার’ দাবি করে টাকা আদায় করছে। টাকা না দিলে গালাগাল, ধাক্কাধাক্কি, এমনকি ব্যাগ টেনে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে প্রতিদিন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়—এক ব্যক্তি লাল টি-শার্ট পরে হাতে দুটি ব্যাগ নিয়ে লঞ্চে উঠতে যাচ্ছিলেন। ব্যাগে ছিল নিজের বাড়ি রং করার জন্য চার-পাঁচটা রঙের ডিব্বা। ঠিক তখন সবুজ টি-শার্ট পরা আরেক ব্যক্তি তার গায়ে হাত দিয়ে দাঁড় করায়। দাবি করে—“ঘাটের ইজারা তার, লঞ্চে উঠতে হলে টাকা দিতে হবে।”

এমন ঘটনার অভিযোগ একদিনের নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলে জানিয়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা।

‘বড় ব্যাগ মানেই টাকা দিতে হবে’

লালবাগ থেকে আগত রাজমিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম বলেন,

“এক ব্যাগে রঙ, ব্রাশ, আর সরঞ্জাম ছিল। লঞ্চে উঠতেই একজন এসে বলে ৫০ টাকা দিতে হবে। না দিলে যেতে দেবে না। আমি বললাম—এটা তো আমার নিজের জিনিস। তখনই গালাগাল শুরু করে।”

যাত্রী সালমা বেগম বলেন,

“আমার সঙ্গে দুইটা ব্যাগ ছিল। তারা বলল ব্যাগ বড়, ইজারার টাকা দিতে হবে। না দিলে ব্যাগ খুলে দেখতে চাইল। ভয় পেয়ে টাকা দিয়েছি।”

বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করে, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ঘাটের ভেতরে কয়েকটি গ্রুপ খোলাখুলি ঘুরে বেড়াচ্ছে, নিজেদের ‘ইজারাদারের লোক’ পরিচয় দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা তোলে।

এক ট্রলিবাহী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,

“আমরা ইজারার টাকা দেই, কিন্তু যারা যাত্রীদের ধরে টাকা নেয়, তাদের কেউ কিছু বলে না। সব ভাগাভাগি হয়।”

আইন যা বলে

নৌযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ আদায় বেআইনি। ঘাট ফি বা ইজারার টাকা নির্ধারিত হয় ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহনের জন্য—ব্যক্তিগত যাত্রার ক্ষেত্রে নয়।

নৌ নিরাপত্তা বিশ্লেষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন,

“ইজারার সুযোগকে যারা দখলদারিত্বে পরিণত করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিলে এই চাঁদাবাজি আরও ছড়াবে। যাত্রী নিরাপত্তা তখন কাগজেই থাকবে।”

অভিযোগ জানাতে ভয়

যাত্রীরা জানালেন, অভিযোগ করলে পরদিন ফেরার পথে চিনে ফেলবে এই ভয়ে তারা নীরব থাকেন।

এক নিয়মিত যাত্রী বলেন,

“প্রতিবাদ করলে তারা চেনে ফেলে, পরের বার নামতে গেলে হয়রানি করে। তাই চুপ থাকি।”

প্রয়োজন তদারকি ও কঠোর ব্যবস্থা

সদরঘাট শুধু একটি লঞ্চঘাট নয়—এটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথের প্রাণকেন্দ্র। এখানে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশের নৌপরিবহন ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

প্রশাসনের উচিত—ইজারাদারের নামে পরিচালিত চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা, ঘাটে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো, ও অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *