আলবেনিয়ায় আটক ই-অরেঞ্জ কেলেঙ্কারির হোতা সোহেল রানা

বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ই-অরেঞ্জ প্রতারণা। কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা যখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, ঠিক তখনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন পুলিশের বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা ও ই-অরেঞ্জের নেপথ্যের কারিগর শেখ সোহেল রানা
দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা এই কর্মকর্তা এখন পূর্ব ইউরোপের দেশ আলবেনিয়ার কারাগারে বন্দি। আর সেখানে গিয়ে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে নতুন এক নাটক শুরু করেছেন।

সোহেল রানা কোথায়? লেবানন না আলবেনিয়া?

বাংলাদেশে মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকেই সোহেল রানার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। প্রথমে দাবি ওঠে— তাকে লেবাননে আটক করা হয়েছে। পরে ইন্টারপোলের সহায়তায় আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানার প্রাক-বিচার কারাগার সেল ৩০২–এ তার আটক থাকার খবর নিশ্চিত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এমসিএন টিভি।

আশ্রয় প্রার্থনার কৌশল

আলবেনিয়ার মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই সোহেল রানা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। তার দাবি— তিনি বাংলাদেশে হত্যা মামলার আসামি। দেশে ফেরত পাঠানো হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। রাজনৈতিক কারণে তিনি দেশত্যাগ করেছেন।

কিন্তু বাংলাদেশি আদালতের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে কোনো হত্যা মামলা নেই। রয়েছে ৯টি মামলা, যার মধ্যে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাত, প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগ।

আলবেনিয়ার টিভি প্রতিবেদন

২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল এমসিএন টিভির প্রচারিত তিন মিনিটের একটি প্রতিবেদনে সোহেল রানার আটকাবস্থার কথা জানানো হয়। সেখানে তাকে “হত্যার আসামি” হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এটি ছিল তার নিজের দাবি, যা পরে যাচাইয়ে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

সেদিনই এমসিএনের ৩০ মিনিটের একটি টকশোতে দুইজন আইনজীবী— ইলি গেরদুপিরেডন মেকসি অংশ নেন। তারা বলেন:

আইন লঙ্ঘন করে সোহেল রানাকে আটক রাখা হয়েছে। তার আশ্রয় আবেদনটি এখনো পর্যালোচনা করা হয়নি। তাকে বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া আটকে রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে পারে।

এই আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, সোহেল রানা নিজের অবস্থানকে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

বাংলাদেশ-আলবেনিয়া প্রত্যর্পণ বাস্তবতা

বাংলাদেশের সঙ্গে আলবেনিয়ার সরাসরি কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। এ কারণে তাকে দেশে ফেরত আনা একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়া।
সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে ইন্টারপোল রেড নোটিশ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো হয়। তবে অভিযুক্ত যদি আশ্রয় আবেদন করেন, তখন বিষয়টি আরও জটিল হয়ে যায়।

আলবেনিয়ার আইন অনুযায়ী:

আশ্রয় আবেদনকারীর দাবি পর্যালোচনার আগে তাকে ফেরত পাঠানো যায় না। আবেদন মঞ্জুর হলে তিনি শরণার্থী মর্যাদা পেতে পারেন।আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তাকে প্রত্যর্পণ করা সম্ভব।

অতএব, সোহেল রানার আশ্রয় আবেদন প্রসেস শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া থমকে থাকতে পারে।

ই-অরেঞ্জ কেলেঙ্কারির ভুক্তভোগীরা আজ কোথায়?

বাংলাদেশে হাজার হাজার গ্রাহক ই-অরেঞ্জের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কেউ বাড়ি বিক্রি করে, কেউ ধার করে, আবার কেউ নিজের সঞ্চয় খুইয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে পণ্য অর্ডার করেছিলেন।
কিন্তু পণ্য না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। তাতে অনেক পরিবার পথে বসেছে। অনেকে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রাহকরা এখনো টাকা ফেরতের আশায় দিন কাটাচ্ছেন।

তাদের কাছে সোহেল রানা শুধু প্রতারক নন, বরং একটি ভয়াবহ কেলেঙ্কারির মূল হোতা।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন:

সোহেল রানার আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান করাতে বাংলাদেশকে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা নিতে হবে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে মামলার সত্যতা ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ তুলে ধরতে হবে। অন্যথায় তিনি আলবেনিয়ায় শরণার্থী মর্যাদা পেতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে তাকে দেশে ফেরানো কঠিন হবে।

শেখ সোহেল রানা এখন আলবেনিয়ার কারাগারে বন্দি। কিন্তু তিনি চতুরতার সঙ্গে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার ফাঁদে ঢুকে নতুন একটি কৌশল নিয়েছেন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে দ্রুত দেশে ফেরানো। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এই হোতা একদিন হঠাৎ মুক্তি পেয়ে আবারও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *