শালিখায় তালাকের সংখ্যা বেড়েছে

মাগুরার শালিখা উপজেলায় গত কয়েক বছরে দ্রুত বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের হার। উপজেলা বিচারকার্য, ইউনিয়ন পরিষদ ও পারিবারিক আদালতের নথিতে দেখা যায়—শুধু গত বছরেই ৫৮১টি সংসার আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে গেছে। তালাকের আবেদন ও উদ্যোগের বড় অংশ এসেছে নারীদের দিক থেকে।

স্থানীয় চেয়ারম্যানরা জানান—আগে যেখানে মাসে কয়েকটি তালাকের আবেদন আসত, এখন সপ্তাহেই কয়েকটি আসে। সালিশ বোর্ড ও ইউনিয়ন পরিষদে সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে কিছু মামলা পারিবারিক আদালতে পৌঁছায়।

শালিখায় সাক্ষাৎকার ও নথি বিশ্লেষণে তালাকের বেশ কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে—

  • পারিবারিক সহিংসতা
  • আর্থিক চাপ ও অনিশ্চয়তা
  • বাল্যবিবাহের পর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া
  • স্বামীর বিদেশ বা শহরে গিয়ে যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া
  • সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নতুন সম্পর্ক-সংকট
  • নারীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতা

এক স্কুল শিক্ষিকা বলেন, “আগে সহ্য ছাড়া উপায় ছিল না। এখন সমস্যা হলে বের হয়ে নতুনভাবে জীবন গড়া যায়—মেয়েরা এটা ভাবতে পারে।”

স্থানীয় সালিশ ও আইনজীবীদের মতে—তরুণ বয়সে বিয়ে হওয়াও তালাক বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। পারিবারিক আদালতের এক আইনজীবী বলেন, “১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী দম্পতিদের বিচ্ছেদ সবচেয়ে বেশি। শুরুতেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক দেখা যায়।”

বিদেশে কাজের জন্য বিয়ের পরপরই স্বামী চলে যাওয়ার ঘটনাও এখানে সাধারণ। যাত্রার পর যোগাযোগ কমা, দায়িত্ব বণ্টন এবং আয়ের অনিশ্চয়তা থেকে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়।

একই সময়ে নারীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে। ফলে নারীরা আগের মতো পুরোপুরি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল নন। এতে পরিবারে সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন এসেছে।

তালাক এখন আর বিরল ঘটনা নয়, তবে বিচ্ছেদের পর নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে পড়ার ঘটনা বেশি। এক সন্তানের মা ও তালাকপ্রাপ্তা এক নারী বলেন, “তালাকের পরে নারী কীভাবে টিকে থাকে—এ নিয়ে সমাজ খুব কম ভাবে।”

সমাজসেবা কর্মকর্তারা মনে করেন—তালাকের সংখ্যা বাড়লেও কাউন্সেলিং, পরিবার পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও বিবাহ-পূর্ব নির্দেশনা খুব সীমিত। বাল্যবিবাহ রোধ এবং পরিবারিক শিক্ষা কর্মসূচি চালু করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন—“তালাক শুধু সংখ্যা নয়, এটা সামাজিক সংকেত। সংকেত বলে—সমস্যা আছে এবং সেটা বাড়ছে।”

শালিখার ৫৮১টি ভাঙা সংসার শত শত মানুষ, শিশু, পরিবার ও সম্পর্কের গল্প। তালাকের হার বাড়তে থাকলে বিষয়টি শুধু পারিবারিক নয়—অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে রূপ নেবে। তাই এখনই গবেষণা, পরামর্শ এবং নীতিগত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *