ফরিদ আহমেদ
ড. রাধাবিনোদ পাল (২৭ জানুয়ারি, ১৮৮৬ – ১০ জানুয়ারি, ১৯৬৭) আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিচারপতি, আইন বিশেষজ্ঞ ও লেখক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, অক্ষশক্তিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে নুরেমবার্গ ও টোকিওতে দুটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। হিটলারের মন্ত্রিপরিষদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিচার হয় নুরেমবার্গে, আর জাপানের সামরিক নেতা জেনারেল হিদেকি তোজোকে বিচার করা হয় টোকিওতে।
ড. রাধাবিনোদ পাল টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। আদালতে অনবরত মিত্রশক্তি তোজোকে ফাঁসির জন্য চাপ দিচ্ছিল, এবং সবাই ধারণা করছিলো, বিচারপতি পালও তাদের পক্ষ নেবেন। কিন্তু ৮০০ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায়ে তিনি মিত্রশক্তি ও পুরো বিশ্বকে বিস্মিত করেন।
বিচারপতি পাল আইনের শাসনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতায় দৃঢ় বিশ্বাসী। তিনি তার রায়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্ক সৃষ্টি করে:
১. মিত্রশক্তির তিন প্রধান কর্তৃক যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন।
২. আন্তর্জাতিক আইনের সংযম ও নিরপেক্ষতার নীতিমালা উপেক্ষা।
৩. জাপানের আত্মসমর্পণ ইঙ্গিত উপেক্ষা করে পারমাণবিক বোমার ব্যবহার।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে পক্ষপাতিত্ব দেখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, টোকিও আদালতও নিরপেক্ষ হতে পারবে না। রায়ে উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইয়াল্টা সম্মেলনে রুজভেল্ট, স্ট্যালিন ও চার্চিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দ্রুত স্তিমিত করতে প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে তাতেও ৬ আগস্ট হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। ড. পাল এই আঘাতকে অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন।
তিনি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিহত মানুষদের সংখ্যা উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন যে, এই বোমা বিশ্বশান্তি ও মানবতার জন্য হুমকিস্বরূপ। বিচারপতি পালের রায়ের সাহস এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি অটল অবস্থান পরাক্রমশালী মিত্রশক্তির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মানবতার পক্ষে একটি যুগান্তকারী বার্তা হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে।
ড. রাধাবিনোদ পালের জন্ম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের সালিমপুর মৌজার তারাগুনিয়া গ্রামে। পিতার নাম বিপিন বিহারি পাল। ১৯০৮ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে সম্মানসহ উত্তীর্ণ হন। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ১৯১১–১৯২০ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯২১ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ল’জ ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি দীর্ঘদিন ইন্ডিয়া সরকারের আয়কর আইন উপদেষ্টা ছিলেন এবং ইউনিভার্সিটি ল কলেজের অধ্যাপকও ছিলেন। ১৯৪১–১৯৪৩ পর্যন্ত হাইকোর্টের বিচারক, ১৯৪৪–১৯৪৬ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
জাপানিরা তাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাপান সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তার এই বিশ্বাস সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৬৬ সালে শেষবারের মতো জাপান সফরকালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বিশাল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকে সম্মান জানায়। আজও পাল ফাউন্ডেশন তার স্মৃতিকে ধরে রাখছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জুরিসপ্রুডেন্স নিয়ে বহু কর্মসূচি চালাচ্ছে।
শান্তির আশায় তিনি পৈতৃক ভিটা কুষ্টিয়ার কাকিলাদহে ফিরে আসার ইচ্ছা পোষণ করলেও ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের ফলে তা শত্রুসম্পত্তিতে পরিণত হয়।
ড. রাধাবিনোদ পালের জীবন, রায় এবং নীতি আজও বিচার ও মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য বিশ্বের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।