জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে— ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’। এতে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, মানবাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নারীর অধিকার, প্রবাসী কল্যাণ, পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা—এই সব খাত মিলিয়ে মোট ৩৬ দফা অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্রান্ড হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে দলটির শীর্ষ নেতারা বলেন, এই ইশতেহার মূলত তরুণদের অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি।
বিচার, মানবাধিকার ও জবাবদিহি
ইশতেহারে অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারকে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণহত্যা, শাপলা চত্বর, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে।
জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশে ‘হিসাব দাও’ পোর্টাল চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ধর্মবিদ্বেষ ও সংখ্যালঘু নির্যাতন ঠেকাতে মানবাধিকার কমিশনের অধীনে বিশেষ তদন্ত সেল গঠনের কথাও রয়েছে।
প্রশাসন ও অর্থনীতি
আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বাড়ানো, পদোন্নতিতে পারফরমেন্সের ভিত্তিতে স্বাধীন কমিশন গঠন এবং তিন বছর পরপর পে-স্কেল হালনাগাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি। শ্রমিকদের জন্য ঘণ্টায় ন্যূনতম মজুরি ১০০ টাকা, পেনশন ও কর্ম-সুরক্ষা বীমা চালুর কথাও বলা হয়েছে।
অর্থনীতিতে কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করা, কর ফাঁকি বন্ধ করা এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যাহারের অঙ্গীকারও রয়েছে।
কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রযুক্তি
আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এসএমই খাতে সহজ ঋণ এবং নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ প্রবাসী কর্মী তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা খাতে একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন, শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামো এবং পাঁচ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য, নারী ও সামাজিক সুরক্ষা
উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন গড়ে তোলা, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা এবং জেলা পর্যায়ে আইসিইউ-সিসিইউ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। এনআইডি-ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড ও জাতীয় স্বাস্থ্য বীমার কথাও বলা হয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন, ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী, পরিবেশ ও পররাষ্ট্রনীতি
প্রবাসীদের জন্য ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল, রেমিটেন্সের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং RemitMiles চালুর ঘোষণা রয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে সীমান্ত হত্যা, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা
ইশতেহারের শেষ অংশে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বড় রিজার্ভ ফোর্স, একটি ইউএভি ব্রিগেড এবং মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এনসিপির ইশতেহার রাষ্ট্র সংস্কার, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নাগরিক অধিকারকে সামনে রেখে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনী রাজনীতিতে এই ৩৬ দফা অঙ্গীকার কতটা জনসমর্থন পায়।