আবু মাসুম
আধুনিক ফরাসি ভাষার বিশ্ববরেণ্য কবিদের মধ্যে লিওপোল্ড সেদার সেঙ্ঘর (Léopold Sédar Senghor) এক অনন্য নাম। তিনি শুধু কবিই নন, একই সঙ্গে ছিলেন একজন দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক ও মানবতাবাদী চিন্তক। সেনেগাল স্বাধীন হওয়ার পর টানা প্রায় দুই দশক (১৯৬০–১৯৮০) দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। রাজনীতি ও সাহিত্য—এই দুই ভিন্ন জগতকে এক সুতোয় গাঁথার ক্ষেত্রে সেঙ্ঘরের ভূমিকা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
সেঙ্ঘর মূলত পরিচিত তাঁর তীক্ষ্ণ মানবিক কাব্যভাষা ও ‘নেগ্রিচ্যুদ’ (Négritude) আন্দোলনের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক হিসেবে। আফ্রিকান পরিচয়, উপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, মানবিক মর্যাদা এবং জীবন-মৃত্যুর দার্শনিক সমন্বয় তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। এই স্বতন্ত্র কাব্যরীতির জন্য তিনি দুইবার নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন, যদিও পুরস্কারটি তিনি পাননি।
বাংলাদেশের সঙ্গেও এই মহান কবির একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক যোগাযোগ রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে লিওপোল্ড সেদার সেঙ্ঘর বাংলাদেশ সফর করেন। একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও চিন্তক সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও আন্তরিক। ১৯৬০ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী সম্মিলনে তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই সম্মিলনে সেঙ্ঘর সৈয়দ আলী আহসানকে “The best poet in Bangladesh” বলে উল্লেখ করেন—যা বাংলা সাহিত্যের জন্য এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মুহূর্ত হিসেবেই বিবেচিত।
সেঙ্ঘর তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি সৈয়দ আলী আহসানকে আগে থেকেই চেনেন এবং বিশ্বের বহু খ্যাতিমান কবি ও বুদ্ধিজীবীর কাছে তাঁর কাব্যসুনাম শুনেছেন। শুধু তাই নয়, সৈয়দ আলী আহসানকে উদ্দেশ্য করে তিনি একটি কবিতাও রচনা করেন। সেই কবিতার ভাবগত অনুবাদে উঠে আসে শৈশব, স্বর্গ, জীবন ও মৃত্যুর চিরন্তন মেলবন্ধন—যা সেঙ্ঘরের কাব্যচিন্তার কেন্দ্রে অবস্থান করে।
সেঙ্ঘরের কবিতায় বারবার ফিরে আসে হারানো ভূমি, পূর্বপুরুষ, মৃতজন ও জীবিতের সহাবস্থান। তিনি লেখেন—
“আমি সর্বদা শৈশব এবং স্বর্গকে মিলিয়ে ফেলি,
এবং মিলিয়ে ফেলি মৃত্যু এবং জীবনকে।”
অন্য এক কবিতায় তাঁর উচ্চারণ—
“হে মৃতগণ, তোমরা চিরকাল মৃত্যুকে বাধাগ্রস্ত করেছ।”
এই উচ্চারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেঙ্ঘরের দর্শন—মৃত্যু তাঁর কাছে সমাপ্তি নয়, বরং জীবনেরই এক বিস্তৃত রূপ। জীবন ও প্রেম, স্মৃতি ও ইতিহাস, ব্যক্তি ও সামষ্টিক অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়েই তাঁর কবিতা।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে তিনি নেহরু পুরস্কারে ভূষিত হন। ফরাসি একাডেমির সদস্য হিসেবেও তিনি ইতিহাস গড়েন—যা একজন আফ্রিকান কবির জন্য ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।
কাব্যপাঠকদের জন্য লিওপোল্ড সেদার সেঙ্ঘরের কবিতা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মানবতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জীবন-মৃত্যুর গভীর দার্শনিক অনুসন্ধানে আগ্রহী পাঠকদের জন্য সেঙ্ঘরের কবিতা পাঠ শুধু প্রয়োজনীয় নয়, বরং অপরিহার্য।
লেখক : কবি. বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্ত-সাংবাদিক