নদী–খাল নেই, তবুও ৯ কোটি টাকার ব্রিজ: কালিহাতীতে সওজ প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন

জাকির হোসেন

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় এমন এক স্থানে ৯ কোটি টাকার ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে নেই কোনো নদী, খাল বা জলাশয়। চারপাশে রয়েছে বসতবাড়ি ও পাকা রাস্তা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও বিস্ময় তৈরি হয়েছে।

ঘটনাস্থল টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ী ইউনিয়নের রতনগঞ্জ খিলগাতী এলাকা। সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)-এর অর্থায়নে এখানে ৩৪ দশমিক ৮৮ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ কোটি ১০ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা। কাজটি পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা লিমিটেড। বাস্তবায়নে রয়েছে মনোজ ও সুমন নামে দুই ঠিকাদার, যাদের বিরুদ্ধে সওজের বিভিন্ন কাজে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আগে থেকেই রয়েছে বলে স্থানীয় ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজ নির্মাণস্থলের দুই পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়িঘর ও রাস্তা রয়েছে। আশপাশে নেই কোনো নদী, খাল বা জলাশয়, যেখানে পানি প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ আছে। তবুও ইতোমধ্যে ব্রিজের পাইলিংয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এখানে ব্রিজ নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। নাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সার্ভেয়ার বেনজীর আহমেদ জানান, “এখানে কখনোই নদী বা খাল ছিল না। অকারণে সরকারি টাকা অপচয় করা হচ্ছে।” রতনগঞ্জ বাজার এলাকার নুরুজ্জামাল ও আলম মিয়া বলেন, “নদী বা খাল না থাকলে ব্রিজের দরকার কী? দুই পাশে শুধু রাস্তা আর বাড়িঘর।”

খিলগাতী গ্রামের নান্নু মিয়া, আজগর আলী ও ইলিমুদ্দিনের ভাষায়, “জলাশয় ছাড়া ব্রিজের কোনো মানে নেই। শুনেছি  “আগে এখানে লোহার ব্রিজ ছিল। ভবিষ্যতে বন্যা হলে যাতে পানি প্রবাহিত হতে পারে, সেই পরিকল্পনা থেকেই ব্রিজ করা হচ্ছে।” এখন দুই যুগ ধরে মানুষ বসতি গড়েছে, পানি চলাচলের কোনো পথ নেই।”

এ বিষয়ে নাগবাড়ী ইউনিয়নের নায়েব মৌজা ম্যাপ ও ভলিয়ম বই পর্যালোচনা করে জানান, সিএস, আরএস ও বিএস রেকর্ডে সরকারি রাস্তা ছাড়া ওই স্থানে কোনো নদী, খাল বা জলাশয়ের অস্তিত্ব নেই।

ঠিকাদার মনোজ ও সুমন জানান, তারা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছেন এবং নিয়ম মেনেই কাজ করছেন। তাদের বক্তব্য, “আমরা না করলে অন্য কেউ করতো।”

টাঙ্গাইল জেলা নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নূর মোহাম্মদ রাজ্য বলেন, “একদিকে যেখানে প্রয়োজনীয় ব্রিজ ও কালভার্ট না থাকায় মানুষ দুর্ভোগে পড়ে, অন্যদিকে এমন লোক দেখানো প্রকল্পে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়। এসব বিষয়ে জবাবদিহি জরুরি।”

স্থানীয়দের দাবি, অপ্রয়োজনীয় এই ব্রিজের পরিবর্তে প্রকৃত প্রয়োজন থাকা স্থানে সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করলে জনস্বার্থ রক্ষা হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *