শ্রীলঙ্কায় ২০১৯ সালের ভয়াবহ বোমা হামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। দেশটির অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সাবেক গোয়েন্দা প্রধান সুরেশ সাল্লেকে গ্রেপ্তার করেছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় তাকে ৭২ ঘণ্টার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, দীর্ঘ ছয় বছরের অনুসন্ধানের পর এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কোনো নিরাপত্তা কর্মকর্তার গ্রেপ্তার।
২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল, ইস্টার রবিবারে একযোগে হামলা হয় রাজধানী কলম্বোর তিনটি বিলাসবহুল হোটেল এবং তিনটি গির্জায়। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে অন্তত ২৬৭ থেকে ২৭৯ জন নিহত হন। আহত হন প্রায় ৫০০ জন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন।
হামলার দায় স্বীকার করে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট । তবে শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলাকারীরা ছিল স্থানীয় উগ্রপন্থী সংগঠন ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত (এনটিজে)-এর সদস্য।
এই হামলাকে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তদন্তে বহুবার উঠে এসেছে যে হামলার আগে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সেই তথ্য যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
সুরেশ সাল্লে ২০১৯ সালে গোতাবায়া রাজাপক্ষে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হন। পরে ২০২৪ সালে বর্তমান রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমার দিশানায়েকে ক্ষমতায় এলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
একটি পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মৈত্রীপালা সিরিসেনা-সহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
ইস্টার হামলার ঘটনায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন। সাবেক পুলিশ প্রধান পুজিথ জয়সুন্দরা এবং সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব হেমাসিরি ফার্নান্দোর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়।
এছাড়া হামলার কথিত মূল পরিকল্পনাকারী মোহাম্মদ নউফারের বিরুদ্ধেও মামলা চলছে। ২০২১ সালে ২৪ জনের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিচার বিলম্বিত হয়েছে।
ইস্টার হামলার তদন্ত শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কে ঘেরা। শ্রীলঙ্কার ক্যাথলিক চার্চের প্রধান কার্ডিনাল ম্যালকম রঞ্জিত প্রকাশ্যে বলেছেন, এই হামলার পেছনে “বৃহৎ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র” থাকতে পারে। তিনি বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তুলেছেন।
বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ৭২ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সুরেশ সাল্লেকে আদালতে তোলা হবে। তখন তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের বিস্তারিত জানা যাবে।
ছয় বছর পর এই গ্রেপ্তার নতুন করে আশা জাগালেও, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর একটাই দাবি—পূর্ণ সত্য উদঘাটন এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তি। তদন্ত এখন কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।