মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে তুরস্কের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেপকন তাদের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শাখার নাম পরিবর্তন করেছে। নতুন নাম রাখা হয়েছে প্যালিজেন টেকনোলজিস।
ইসরায়েলের কাছে বোমা বিক্রির একটি বড় চুক্তি সামনে আসার পর প্রতিষ্ঠানটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এর পরপরই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এটি মূলত বিতর্ক কমানোর জন্য কর্পোরেট “রিব্র্যান্ডিং”।
২০২৫ সালের মার্চে রেপকন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোম্পানি জেনারেল ডিনামিকস-এর কাছ থেকে টেক্সাসের গারল্যান্ডে একটি গোলাবারুদ উৎপাদন কারখানা কিনে নেয়।
এই কারখানাটি যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎপাদন কেন্দ্র। এখানে MK-80 সিরিজের বোমা-এর বোমার বডি তৈরি হয়। এই বোমাগুলো পরে জয়েন্ট ডিরেক্ট এটাক মিউনিশন (JDAM) গাইডেন্স কিটের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ বোমাকে নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রে পরিণত করে।
বিতর্ক শুরু হয় ২০২৬ সালের মার্চে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন কংগ্রেসের পূর্ণ পর্যালোচনা ছাড়াই ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৬৬০ মিলিয়ন ডলারের বোমা বিক্রির অনুমোদন দেয়।
এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল—
- প্রায় ১২ হাজার BLU‑110 bomb
- প্রায় ১০ হাজার ২৫০ কিলোগ্রাম শ্রেণির বোমা
এসব বোমার বডি তৈরি হচ্ছিল রেপকনের মার্কিন কারখানায়।
বিতর্কের বড় কারণ ছিল তুরস্কের রাজনৈতিক অবস্থান।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচক। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর আঙ্কারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কড়া রাজনৈতিক অবস্থান নেয় এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও আরোপ করে।
কিন্তু একই সময়ে তুরস্কের মালিকানাধীন একটি কোম্পানির মাধ্যমে ইসরায়েলের জন্য বোমা উৎপাদনের খবর সামনে এলে অনেকেই এটিকে দ্বৈত নীতি হিসেবে দেখেন।
এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান দি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন-এর বিশ্লেষকরা বলেন, বিদেশি মালিকানাধীন একটি কোম্পানির হাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই অধিগ্রহণ অনুমোদন দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ তদারকি সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশী বিনিয়োগ সংক্রান্ত কমিটি (CFIUS)। এখন প্রশ্ন উঠেছে, সেই অনুমোদন যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল কি না।
কিছু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, যদি ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে বিদেশি মালিকানার কারণে উৎপাদন বা সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
বিতর্ক বাড়তে থাকায় রেপকন তাদের মার্কিন শাখার নাম বদলে প্যালিজেন টেকনোলজিস রাখে।
কোম্পানির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এটি মূলত ব্যবসায়িক পরিচয় নতুনভাবে সাজানোর একটি উদ্যোগ। কিন্তু সমালোচকদের মতে, নাম পরিবর্তন করলেও মালিকানা বা কার্যক্রমের বাস্তবতা বদলায় না।
ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদনের সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে “জরুরি অবস্থা” হিসেবে তুলে ধরে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দ্রুত অস্ত্র সরবরাহের প্রয়োজন তৈরি করেছে।
তবে কংগ্রেসের কিছু সদস্য এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে কংগ্রেসের পূর্ণ পর্যালোচনা এড়িয়ে যাওয়া স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এই ঘটনা তুরস্কের জটিল কূটনৈতিক অবস্থানও সামনে এনেছে।
একদিকে দেশটি ন্যাটোর সদস্য। অন্যদিকে তারা রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মুখে পড়েছিল।
এর পাশাপাশি সিরিয়ায় কুর্দি বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং গ্রিসের সঙ্গে এজিয়ান সাগর নিয়ে বিরোধ তুরস্কের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রেপকনের নাম পরিবর্তনের ঘটনা আবারও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—বহুজাতিক অস্ত্র কোম্পানিগুলো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে ব্যবসা করার সময় কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিদেশি মালিকানার প্রভাব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নাম বদলে এখন সেটি প্যালিজেন টেকনোলজিস হলেও বিতর্কের মূল প্রশ্নগুলো এখনও রয়ে গেছে।