মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ব যেন এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি—১৯ শতকের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’ বা যুদ্ধজাহাজ-নির্ভর কূটনীতির পুনরাবির্ভাব। তবে দি ইকোনমিস্ট-এর এক বিশ্লেষণ বলছে, আধুনিক বিশ্বে এই পুরনো কৌশল বারবার ব্যর্থতার মুখে পড়ছে।
প্রতিবেদনটি একটি রূপক চিত্র তুলে ধরে—ট্রাম্প যেন ‘মাটন-চপ দাড়ি, ফ্রক কোট ও তলোয়ার’ পরে বসে আছেন, ১৯ শতকের সাম্রাজ্যবাদী যুগের প্রতীকী সাজে। সেই যুগের মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি-এর সময়কার কৌশল যেন তিনি পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছেন। ইরান থেকে ভেনেজুয়েলা—আধুনিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় তিনি পুরনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু বাস্তবতা বারবার তার এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি, ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার কয়েকদিন আগে ফক্স নিউজ-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কূটনৈতিক সমন্বয়ক স্টিভ উইটকফ বিস্ময় প্রকাশ করেন—কেন ইরানের নেতারা আত্মসমর্পণ করছেন না। মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি সত্ত্বেও তেহরান কেন পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসছে না—এই প্রশ্নও তিনি প্রকাশ্যে তোলেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই কৌশলের ব্যর্থতার উদাহরণ একাধিক।
ইরান প্রসঙ্গ: ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেন, “এক বিশাল আর্মাডা ইরানের দিকে যাচ্ছে।” তিনি জানান, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন প্রয়োজনে দ্রুত ও হিংস্রভাবে তার মিশন সম্পন্ন করতে প্রস্তুত। তবুও, মুদ্রার পতন ও অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ সত্ত্বেও তেহরান আত্মসমর্পণ করেনি। বরং তারা “অসীম” ও “অভূতপূর্ব” প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গ: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ানে মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক সমাবেশ ঘটে, যার নেতৃত্বে ছিল ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড। ৩৮টি হামলায় ১২৪ জন নিহত হওয়ার পরও নিকোলাস মাদুরো-এর সরকার টিকে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করা হয়—যা কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ফল।
হরমুজ প্রণালী: গুরুত্বপূর্ণ এই তেলপথ হরমুজ প্রণালী ইরান বন্ধ করে দেয়। ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে এটি দখল করা হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র প্রায় ২ কিলোমিটার প্রস্থের এই প্রণালী সামরিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব। সস্তা মাইন ও দ্রুতগতির স্পিডবোট ব্যবহার করে ইরান বড় যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
দি ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের মূল সমস্যা তার বিশ্বাস—হুমকি ও শক্তি প্রদর্শনই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু বাস্তব গবেষণা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ১৯৯২ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাধ্যতামূলক কূটনীতির সাফল্যের হার ছিল মাত্র ৩৩.৩ শতাংশ।
ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট:
অতিরিক্ত দাবি: যখন একটি দেশের কাছে এমন দাবি তোলা হয়, যা তার শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে, তখন প্রতিরোধ ছাড়া বিকল্প থাকে না।
আধুনিক যুদ্ধের রূপান্তর: ইরান ‘সামুদ্রিক গেরিলা যুদ্ধ’ কৌশল ব্যবহার করছে—স্বল্প খরচে তৈরি মাইন ও দ্রুতগতির নৌযান দিয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজকে টার্গেট করা হচ্ছে।
সফট পাওয়ারের ক্ষয়: এই ধরনের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে এটি ঔপনিবেশিক অতীতের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
ট্রাম্পের নীতির ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর বাড়ছে চাপ। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই তিনি ইয়েমেন, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও ভেনেজুয়েলায় হামলার নির্দেশ দেন—যা তার পূর্বসূরি জো বাইডেন-এর চার বছরের মোট সামরিক কার্যক্রমকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীর প্রায় ১৫ শতাংশ ক্যারিবিয়ানে মোতায়েন রাখা হয়েছে—যেখানে প্রকৃত কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে, বিশেষ করে চীনের প্রেক্ষাপটে, আরও বেশি গুরুত্ব দাবি করে।
প্রতিবেদনটি স্মরণ করিয়ে দেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট-এর বিখ্যাত উপদেশ: “নরমভাবে কথা বলুন, কিন্তু একটি বড় লাঠি হাতে রাখুন।” বাস্তবে ট্রাম্প যেন উল্টো পথে হাঁটছেন—জোরালো হুমকি দিচ্ছেন, কিন্তু কার্যকর ও সুসংহত কৌশল গড়ে তুলতে পারছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’ এখন আর কার্যকর নয়। আধুনিক কূটনীতিতে সামরিক শক্তি একটি উপাদান হলেও, সেটিই প্রধান নয়; বরং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও বহুমাত্রিক কৌশলই নির্ধারণ করে সাফল্য।
বর্তমান পথ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
দি ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদন—শুধু একটি পর্যবেক্ষণ নয়; এটি এক ধরনের সতর্কবার্তা। ১৯ শতকের কৌশল দিয়ে ২১ শতকের জটিল বাস্তবতা মোকাবিলা করা যায় না।