যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও কানাডার নেতারা হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌপরিবহন নিশ্চিত করতে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। এই সাত দেশ ইরানের কাছে প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার সব ধরনের প্রচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ পুনরায় খুলে দিতে সহায়তার প্রস্তুতি প্রকাশ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া ইরান শুধু প্রণালী বন্ধ করেই থেমে থাকেনি। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার ঘটনাও ঘটছে। বৃহস্পতিবার (১৯শে মার্চ) একটি সৌদি রিফাইনারিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়, যা লোহিত সাগর দিয়ে বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে সাত দেশের নেতারা বলেন:
“আমরা ইরানের বেসামরিক জাহাজে হামলা, তেল ও গ্যাস স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে আক্রমণ এবং ইরানি বাহিনীর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানাই।”
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়:
- ইরানকে অবিলম্বে হুমকি, মাইন পাতা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে হবে
- জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৮১৭ মেনে চলতে হবে
- নৌপরিবহন স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি
- বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি
যৌথ বিবৃতিতে সহায়তার প্রস্তুতির কথা বলা হলেও, কীভাবে সেই সহায়তা দেওয়া হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। কানাডার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড ম্যাকগিনটি জানান, ইরানের প্রতিবেশীরা ন্যাটোর সহায়তা চাইলে কানাডা বিষয়টি “বিবেচনা” করবে।
অন্যদিকে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান আগেই যুদ্ধকালীন সময়ে প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়ে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে দুটি যুদ্ধজাহাজ অঞ্চলে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা ফ্লোরিডার সেন্টকম সদরদপ্তরে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যৌথ পরিকল্পনায় অংশ নিচ্ছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলতে মিত্রদের সহায়তা চাইলেও ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে। তারা পরিস্থিতি শান্ত করার ওপর জোর দিচ্ছে।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সহায়তায় প্রণালী খুলতে সক্ষম হবে। তবে যারা এগিয়ে আসবে না, তাদের বিষয়টি তিনি মনে রাখবেন বলেও ইঙ্গিত দেন।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। এই প্রেক্ষাপটে সাত দেশের নেতারা—
- আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) সমন্বিত কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ মুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন
- উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তেল উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেছেন
- জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন
এই যৌথ বিবৃতি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক জোটের বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলো—বিশেষ করে জাপান ও কানাডা—একসঙ্গে অবস্থান নিয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের ঠিক আগে এই বিবৃতিতে যোগ দেন, যা কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ মূলত কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে, সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সামরিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পরিস্থিতি মোকাবিলায় “প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা” গ্রহণ করছে। যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে মার্কিন সেন্টকমের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করেছে।
তবে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠন হবে কি না, তা নির্ভর করছে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে সাত দেশের এই যৌথ বিবৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে ইরানের প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। এর কার্যত বন্ধ থাকা বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় মিত্রদের অনিশ্চিত সামরিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প কৌশলও বিবেচনা করতে হচ্ছে।