মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবারও নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথকে কেন্দ্র করে ইরান চালু করেছে একটি নতুন ‘ভেটিং ও রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচিত জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট ‘নিরাপদ করিডোর’ ব্যবহার করে প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নিরাপত্তা উদ্যোগ নয়; বরং তেহরানের পক্ষ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী (IRGC)-এর তত্ত্বাবধানে একটি ‘নিরাপদ শিপিং করিডোর’ চালু করা হয়েছে। করিডোরটি ইরানের সামুদ্রিক সীমানার ভেতর দিয়ে পরিচালিত হয়, বিশেষ করে লারাক দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায়, যেখানে IRGC নৌবাহিনী এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলোর দৃশ্যমান পরীক্ষা ও তদারকি করে।
এই করিডোর ব্যবহার করতে হলে জাহাজ মালিকদের পূর্বেই বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হয়। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে জাহাজের মালিকানা, বহনকৃত পণ্যের ধরন এবং গন্তব্য। এই তথ্য সরাসরি IRGC-এর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, সাধারণত ইরান-সমর্থিত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে।
তথ্য অনুযায়ী, অন্তত নয়টি জাহাজ ইতোমধ্যে এই করিডোর ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- ভারতীয় গ্যাস ট্যাঙ্কার: শিবালিক, নন্দা দেবী ও জগ লাদকি—এই তিনটি জাহাজ সফলভাবে প্রণালী পার হয়ে ভারতে পৌঁছেছে।
- পাকিস্তানের আফ্রাম্যাক্স ট্যাঙ্কার: করাচি (IMO: 9903413)।
- মার্কিন নিষেধাজ্ঞাধীন জাহাজ: ব্লুমিং ডেল, সি বার্ড ও সালুট—এই তিনটি ট্যাঙ্কারও একই করিডোর ব্যবহার করেছে।
বর্তমানে এই অনুমোদন ব্যবস্থা ক্ষেত্রভিত্তিক (case-by-case) হলেও, ভবিষ্যতে এটিকে আরও কাঠামোবদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক করার পরিকল্পনা রয়েছে IRGC-এর।
এই করিডোর ব্যবহারের লক্ষ্যে একাধিক দেশ ইতোমধ্যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, মালয়েশিয়া এবং চীন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ১৫ মার্চ এক বিবৃতিতে বলেন, যেসব দেশ তাদের জাহাজের “নিরাপদ পাসেজ” নিশ্চিত করতে আগ্রহী, তাদের সঙ্গে আলোচনায় ইরান উন্মুক্ত রয়েছে।
এই ‘নিরাপত্তা করিডোর’ ব্যবহারের জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। একটি ট্যাঙ্কার অপারেটর প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার প্রদান করেছে বলে জানা গেছে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এই লেনদেন কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ১৬ মার্চ CNBC-কে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি ট্যাঙ্কারগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রণালী অতিক্রমের সুযোগ দিয়েছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি ইরান কার্যত প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র এ অবস্থান মেনে নেবে না।
নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কন্ট্রোল রিস্ক সতর্ক করে বলেছে, IRGC-এর অনুমোদন পাওয়া মানেই নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত নয়। তাদের বিভিন্ন ইউনিট প্রয়োজনে অনুমোদিত জাহাজকেও বিলম্বিত বা আটক করতে পারে।
ইরান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO)-কে জানিয়েছে, প্রণালী বন্ধ করার অভিযোগ “বিভ্রান্তিকর”। দেশটির দাবি, “সন্ত্রাস, জবরদস্তি বা অবৈধ শক্তির স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে সমুদ্র নিরাপত্তা ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় না।”
তবে সমালোচকদের মতে, এই ‘ভেটিং সিস্টেম’ বাস্তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলকে নিয়ন্ত্রণে আনার একটি কৌশল, যা আন্তর্জাতিক নৌ-স্বাধীনতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই করিডোর ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় পরিসরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। বিশেষ করে পাশ্চাত্য-সমর্থিত জাহাজ মালিকরা স্বেচ্ছায় ইরানের নিয়ন্ত্রিত জলসীমায় প্রবেশ করতে অনাগ্রহী থাকবেন।
তবে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রগুলো এই করিডোর ব্যবহার করতে পারে।
একই সঙ্গে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে IRGC-এর নৌসম্পদ এবং এই ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করে, সেই পথ এখন কেবল সামরিক উত্তেজনার নয়, বরং কূটনৈতিক কৌশলেরও পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে।
ইরানের ‘ভেটিং সিস্টেম’—এটি কি কেবল সাময়িক যুদ্ধকালীন ব্যবস্থা, নাকি ভবিষ্যতের একটি দীর্ঘমেয়াদি নৌ-নীতির অংশ—এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে এ মুহূর্তে স্পষ্ট, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল শক্তির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের জটিল সমীকরণের ওপর।