কিউবার অন্ধকারে নিভে যাওয়া প্রাণ, আর অবরোধের নির্মম গল্প

কিউবা থেকে এমন সংবাদ এসেছে যা মানবতার জন্য লজ্জাজনক। একটি হাসপাতালের ভেন্টিলেটরে থাকা সব রোগী মারা গেছেন। কারণ একটাই। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। ভেন্টিলেটরগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এটা আর কোনো একক ঘটনা নয়। চলতি মাসেই কিউবার জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড তিনবার পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, গত এক বছরে যত জরুরি মৃত্যু হয়েছে, গত ত্রিশ দিনে তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন।

হাভানার একটি হাসপাতালে লিউকেমিয়া আক্রান্ত এক রোগী সাংবাদিকদের বলেছেন, জ্বালানি ছাড়া জীবন অতিষ্ঠ। সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা নেই। তারা প্রতিদিন বাঁচার লড়াই করছেন। নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (NICU) শিশুরা এখন নামমাত্র বিদ্যুতে বেঁচে আছে। ডায়ালাইসিস রোগীরা প্রতিটি লোডশেডিংয়ের সাথে মৃত্যুর জুয়া খেলছেন।

গত তিন মাসে কিউবা এক ফোঁটাও তেল পায়নি। এটাকে স্রেফ তেলের অভাব বলা যাবে না। এটি একটি অবরোধ। রাশিয়া থেকে কিউবার উদ্দেশ্যে আসা সাত লক্ষ ত্রিশ হাজার ব্যারেল তেলের জাহাজকে যুক্তরাষ্ট্র আটকে দিয়েছে। তারা জাহাজটিকে ফিরিয়েও দিয়েছে।

অথচ সরকারিভাবে প্রচার চলছে, তারা ছয় মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে। ছয় মিলিয়ন ডলারের সাহায্যের কথা বলা হলো। কিন্তু নয় লক্ষ ত্রিশ হাজার ব্যারেল তেল আটকে দেওয়া হলো। পুরো দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড যখন অন্ধকার, তখন এই টাকা দিয়ে ভেন্টিলেটর ঠিক করা যায় না।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের একটি বক্তব্য আলোচনায় উঠে এসেছে। তিনি বলেছিলেন, কিউবার পতন হবেই। এটাই হবে কেকের ওপরের চেরি। আজ রাতে হাসপাতালে যারা মারা যাচ্ছেন, তারাই সম্ভবত সেই কেকের ওপরের চেরি।

কিউবার ওপর চলমান এই ‘জ্বালানি অবরোধ’ গণহত্যাতুল্য একটি অপরাধ। কিউবা এমন একটি দেশ, যারা ১৯৯০ সালের পর ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েও হাসপাতাল বন্ধ করেনি। মাতৃসেবা বা শিশুযত্ন কেন্দ্র বন্ধ করেনি।

আমরা এমন একটি সময়ে বসবাস করছি যেখানে গাজায় অবরোধ করে লাখ লাখ মানুষকে ত্রাণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কিউবাকেও হাতের মুঠোয় পেতে অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির এখন রূপ বদলেছে। আগে তারা সভ্যতা বা গণতন্ত্রের কথা বলত। এখন কূটনীতি বলে কিছু নেই। স্থুল বলপ্রয়োগই এখন মূল ভাষা। ইরানের ওপর যুদ্ধের যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তা সিনেটের শুনাতিতেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বিশ্বব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার মুখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত একতরফা ধ্বংসলীলা আর দেখা যায়নি। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ মার্কিন অর্থনীতির সাথে বাঁধা। কিন্তু তারা এখন অমর্যাদা ও অনিরাপত্তায় ভুগছে।

ইরান যুদ্ধ যেভাবেই থামুক, দুনিয়া আর আগের জায়গায় ফেরত যাবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী, সেটা ঠিক। কিন্তু তাকে কেন্দ্র করে যে বিশ্বব্যবস্থা ছিল, তার অবসান ঘটেছে। এখন থেকে কেউ আর একক নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে আমেরিকাকে ভাববে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *