শহীদ মিনারের কোলে এক টুকরো বাংলাদেশ: টাঙ্গাইলে এক অনন্য নাট্য সন্ধ্যা

জাকির হোসেন

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণটা যেন কোনো এক মায়াবী ছবির মতো সেজেছিল। ফাল্গুনের শেষ আর চৈত্র শুরুর সেই উদাস বিকেলে টাঙ্গাইলের আকাশটা ছিল নীলচে। উপলক্ষ ছিল ‘মহান স্বাধীনতা ও বিশ্ব নাট্য দিবস ২০২৬’ উদযাপন। । ২৭ মার্চ (শুক্রবার) সন্ধ্যায় টাঙ্গাইলের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে যখন স্বাধীনতা আর বিশ্ব নাট্য দিবসের সুর বাজছিল, তখন কেন জানি মনে হচ্ছিল—বাতাসেরও বুঝি প্রাণ আছে। সেও যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে এই উৎসব দেখছে।

জেলা নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি ও সংকেত নাট্যদলের আয়োজনে এই বিশেষ সন্ধ্যায় সবকিছুই ছিল ছিমছাম। অনুষ্ঠানের শুরুতেই যখন গীতশ্রী সঙ্গীত একাডেমির একঝাঁক শিক্ষার্থী শিল্পী রানী ঘোষের নির্দেশনায় গেয়ে উঠল—‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, তখন চারপাশের শব্দহীন নিস্তব্ধতায় এক অদ্ভুত দেশপ্রেমের সুর ছড়িয়ে পড়ল। মনে হচ্ছিল, গানের প্রতিটি কথা যেন শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলোকে স্পর্শ করে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে।

প্রধান অতিথি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ব্যস্ততার কারণে সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা তার কণ্ঠস্বর যখন স্পিকারে বাজছিল, তখন চারপাশ আবার শান্ত হয়ে এল। তিনি তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে যে মমত্ববোধের কথা বললেন, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দূরত্ব থাকলেও হৃদয়ের টান কখনো ফুরায় না।

অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে নাট্য বিশারদ জনাব গোলাম আম্বিয়া নূরী যখন নাট্যজগত নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন শহীদ মিনারের পাদদেশ এক জ্ঞানালোকের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো। বিশেষ অতিথি ফারুক কোরেশী, মাহমুদুল হক সানু এবং অ্যাডভোকেট মো. মোবারক হোসেনের উপস্থিতি আসরটিকে আরও পূর্ণতা দিয়েছিল। স্বাগত বক্তব্যে ইঞ্জিনিয়ার নূর মোহাম্মদ রাজ্য এক পশলা আবেগ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, আর পুরো অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান।  অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান যখন দেশ গঠনের কথা বলছিলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল এক গভীর স্বপ্ন।

ইঞ্জিনিয়ার নূর মোহাম্মদ রাজ্য যখন ছোট ছোট শিশুদের হাতে উপহার হিসেবে কলম তুলে দিচ্ছিলেন, তখন সেই শিশুদের চোখের ঝিলিকটা ছিল দেখার মতো। হয়তো এই কলমগুলো দিয়েই তারা একদিন সুন্দর আগামীর গল্প লিখবে।

এরপর মায়া ছড়ালো মেহেদী হাসান রিপনের ‘নৃত্য প্রাঙ্গণ’ এবং হাবিবুর রহমান হাবিবের ‘নৃত্য আঙ্গিনা’। শিল্পীদের নাচের প্রতিটি ছন্দে ছিল দেশপ্রেমের এক গভীর টান। অধ্যাপক আবু সুফিয়ানের কথায় তিনটি গান তো শ্রোতাদের একেবারে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। শাহনাজ সিদ্দিকীর গলায় রোমান্টিক সুর, নাজমা আক্তারের আধ্যাত্মিক আর এরফানুজ্জামান রুনুর সেই মাটির ঘ্রাণমাখা ফোক গান—সব মিলিয়ে এক জাদুকরী আবেশ।

শিউলি শিখা, মাহমুদুল হাসান, জামাল মিয়া, রফিক মিয়া, আনোয়ার হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, সাথী আক্তার, সিনথিয়া, শিল্পী রানী ঘোষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মাসুম—সবার কণ্ঠের গান এই সন্ধ্যাকে আরও প্রগাঢ় করে তুলেছিল।

মঞ্চস্থ হয় জাকির হোসেনের নির্দেশনায় সংকেত নাট্যদলের বিশেষ নিবেদন নাটক ‘শয়তানের বাগান’। নাটকের প্রতিটি সংলাপ আর অভিনয়ের মায়াজালে দর্শকরা কখন যে নাটকের ভেতরে হারিয়ে গিয়েছিলেন, তা তারা নিজেরাও টের পাননি।

সঞ্চালনায় সাজু মেহেদী, তালহা আল মাহমুদ ও আরিফ আহমেদ যেন পুরো অনুষ্ঠানটিকে একটি সুতোর মালায় গেঁথে রেখেছিলেন। পুরো আয়োজনটির পেছনে ছায়ার মতো ছিলেন মো. জাকির হোসেন। তার নিরলস পরিশ্রমে সংকেত নাট্যদল আর নাগরিক সুরক্ষা কমিটির এই আয়োজন এক সফল পরিণতি পায়।

রাত যখন একটু একটু করে বাড়ছিল, তখন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ছেড়ে যাওয়ার সময় কেন জানি বুকটা একটু ভারী হয়ে এল। মানুষ বাঁচে কদিন? কিন্তু তার শিল্প, তার সংস্কৃতি আর তার দেশপ্রেম অমর হয়ে থাকে এই ইটের মিনারে, বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে। পঁচিশের কালরাত্রি থেকে সাতাশের এই বসন্ত—এক দীর্ঘ যাত্রা, যা কেবল ভালোবাসার মানুষরাই বুঝতে পারে।

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *