জাকির হোসেন
যখন ছোট ছিলাম, তখন ভাবতাম গান বুঝি আকাশ থেকে পড়ে। বড় হয়ে বুঝলাম, গান আকাশ থেকে পড়ে না, গান আসে মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস থেকে। আজ তেমনই একজন মানুষের গল্প বলব, যার বুকের ভেতর চার হাজার গানের এক বিশাল সমুদ্র জমা হয়ে আছে। মানুষটির নাম প্রফেসর মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান।
আবু সুফিয়ানের লেখালেখির শুরুটা অনেকটা রূপকথার মতো। ছোটবেলায় তিনি যখন খাতায় হিজিবিজি লিখতেন, বাড়ির লোক হয়তো ভাবত ছেলেটা সময় নষ্ট করছে। একবার হলো কী, তাঁর একগাদা লেখার খাতা ভুল করে ফেরিওয়ালার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হলো। ফেরিওয়ালা সেই খাতা নিয়ে গেল এক দোকানদারের কাছে। কিন্তু সেই দোকানদার সাধারণ কেউ ছিলেন না, তাঁর ভেতরে বোধহয় জহুরীর চোখ ছিল।
তিনি খাতাগুলো পড়ে অবাক হয়ে গেলেন। নিজে গিয়ে সুফিয়ান সাহেবের বাবার হাতে খাতাগুলো ফেরত দিয়ে বললেন, “আপনার ছেলে তো অসাধারণ লিখে! এই সম্পদ হারিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।” ভাবা যায়? এক সাধারণ দোকানদারের জহুরীর চোখ না থাকলে আজ আমরা এই চার হাজার গানের জাদুকরকে পেতাম না।
আমরা সাধারণত জানি, অধ্যাপকরা খুব গম্ভীর হন। তাঁরা চশমার ওপর দিয়ে তাকান এবং কঠিন কঠিন সব থিওরি আওড়ান। কিন্তু মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান একটু অন্যরকম। তিনি ক্লাসরুমে লেকচার দেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মনের জানলা দিয়ে সারাক্ষণ বাউল বাতাসের আনাগোনা।
প্রচারবিমুখ এই মানুষটি নিভৃতে বসে চার হাজারেরও বেশি গান লিখে ফেলেছেন। চার হাজার! ভাবা যায়? একেকটি গান যেন একেকটি পোষা পাখি। তিনি যখন তাঁর ‘সুফিয়ান সংগীত’-এর খাঁচা খুলে দেন, তখন সেই পাখিরা ডানা মেলে উড়ে যায় মানুষের হৃদয়ে। তাঁর গানগুলো শুনলে মনে হয়, সুরের আঙিনায় এক রঙিন পাখি একা একা নেচে বেড়াচ্ছে।
সুফিয়ানের গানে কখনো আছে বিরহ, কখনো আছে জীবনের গভীর দর্শন। তাঁর লেখা— “তোমার কথা শুধু কথা নহে গো” কিংবা “পৃথিবীর বুকে কোনো সুখ নাই”—গানগুলো শুনলে মনটা কেন যেন একটু বিষণ্ণ হয়ে যায়। আবার যখন তিনি লেখেন, “আমি পুষ্পেরো মালা পরেছি গলে”, তখন মনে হয় বসন্ত বুঝি খুব কাছেই কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি শুধু গান লেখেন না, তাতে সুরও দেন। মাঝেমধ্যে নিজেই গেয়ে ওঠেন। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা দেখে মাঝেমধ্যে আমার খুব হিংসে হয়। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার এবং লেখক। তাঁর প্রকাশিত ‘গীতি সুধা’ ও ‘গীতি ঝর্ণাধারা’ ছাড়াও আরও বেশ কিছু চমৎকার গ্রন্থ আছে।
আমরা ভাবি, বাউল মনের মানুষ বুঝি কেবল মাটির সোঁদা গন্ধ আর একতারার সুরেই মগ্ন থাকেন। কিন্তু এই জাদুকর মানুষটি আমাদের ভুল প্রমাণ করে দিলেন। তিনি কেবল বাংলা গানেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বেশ কিছু ইংরেজি গানও লিখে ফেলেছেন। ভাবা যায়? যার এক হাতে দেশী একতারা, অন্য হাতে তাঁর ধরা বিলিতি সুরের গিটার। তাঁর এই বৈশ্বিক চিন্তা আর শব্দের কারুকাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সুরের কোনো দেশ নেই, কোনো সীমানা নেই। গান তো আসলে মনের ভাষা; সে বাংলায়ই হোক আর ইংরেজিতেই হোক, অধ্যাপক সুফিয়ানের কলমে তা যেন এক অদ্ভূত মায়ার জন্ম দেয়।
অধ্যাপক সুফিয়ান বড়ই নিভৃতচারী মানুষ। চট করে কোনো অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যায় না। তবে সম্প্রতি সংকেত নাট্যদলের জাকির হোসেনের বিশেষ অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেননি। শহীদ মিনারে বিশ্ব নাট্য দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন।সেই সন্ধ্যায় এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। শিল্পী শাহনাজ সিদ্দিকীর গলায় তাঁর লেখা রোমান্টিক সুরের আবেশ, নাজমা আক্তারের আধ্যাত্মিক আকুতি আর এরফানুজ্জামান রুনুর সেই মাটির সোঁদা ঘ্রাণমাখা ফোক গান—সব মিলিয়ে শহীদ মিনার এলাকাটা যেন এক মুহূর্তের জন্য অন্য কোনো ভুবনে চলে গিয়েছিল।
ফেসবুক (professormdabusufian) আর ইউটিউব চ্যানেলে নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘সুফিয়ান সংগীত’-এর ব্যানারে তিনি তাঁর সৃষ্টির ডালি সাজিয়ে দিয়েছেন। যার মন চাইবে, সে সেখান থেকে সুর কুড়িয়ে নিতে পারে। আমরা হয়তো প্রচারের আলোয় থাকা মানুষদের নিয়ে খুব মাতামাতি করি, কিন্তু আবু সুফিয়ানের মতো নিভৃতচারী সাধকরাই আসলে সংস্কৃতির শিকড়টা ধরে রাখেন।
বাংলা গানের যে ঐতিহ্যবাহী ধারা, তাকে তিনি পরম মমতায় আধুনিক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁর গানে বাউলের সেই মাটির সোঁদা গন্ধ আছে, আবার আধুনিক জীবনের সূক্ষ্ম হাহাকারও আছে।
একজন মানুষ এক জীবনে চার হাজার গান লিখে ফেললেন, অথচ আমরা তাঁর খবর খুব একটা রাখলাম না—এটি কি আমাদের ব্যর্থতা নয়? তবে স্রষ্টার তাতে কিছু যায় আসে না। তিনি তাঁর সৃষ্টিতেই অমর হয়ে থাকেন।
পর্দা যখন নেমে আসে, অডিটোরিয়ামে যখন আলো জ্বলে ওঠে, তখনো কানে লেগে থাকে তাঁর গানের সেই কথাগুলো— “চাঁদের গায়েও যে কলঙ্ক”। আমরা কলঙ্ক খুঁজি, আর প্রফেসর মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান খোঁজেন সুর।
প্রফেসর মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। আপনি আপনার গানের ঝর্ণাধারা বইয়ে দিন, আমরা না হয় মাঝেমধ্যে সেই জলে একটু অবগাহন করে নিজেদের শুদ্ধ করে নেব।