এক মাস আগেও ইরানের নির্বাসিত বিরোধীরা যুদ্ধের উন্মাদনায় মত্ত ছিলেন। গত জানুয়ারিতে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বাহিনী হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে দমন করার পর, অনেক ইরানি আমেরিকা ও ইসরায়েলের কাছে পরিত্রাণের আশায় ছুটে যান। লন্ডন, লস অ্যাঞ্জেলেস ও টরন্টোর রাস্তায় নির্বাসিতদের কোলাহল ছিল চোখে পড়ার মতো—তারা উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর মৃত্যুর খবরে। দেশে ও বিদেশে, হাজার হাজার মানুষ রেজা পাহলভির পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন—শেষ শাহের পুত্র এবং নিজেকে স্থানান্তরকালীন নেতা দাবি করা এই ব্যক্তি বোমাবর্ষণকে “মানবিক” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই চিত্র পাল্টে গেছে।
এখনও কিছু কট্টরপন্থী বোমাবর্ষণকে “কিমোথেরাপি”র সঙ্গে তুলনা করছেন। লন্ডনের রাস্তায় কেউ কেউ ইসরায়েলি পতাকার পাশাপাশি রাজতান্ত্রিক পতাকা নিয়ে মিছিল করছেন। কোথাও কোথাও পারস্য রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে জানালায় পাহলভীর সমর্থনে পোস্টার প্রদর্শন করতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে। লন্ডনভিত্তিক বিরোধী টিভি চ্যানেল ইরান ইন্টারন্যাশনাল যুদ্ধ এবং পাহলভি পরিবারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে একই সময়ে অনেকের মনে সন্দেহের ছায়া ঘনীভূত হয়েছে। সমাবেশগুলোর আকার ছোট হচ্ছে। নির্বাসিতদের মধ্যে আরও বিস্তৃত কণ্ঠস্বর সামনে আসছে। ইরানি সংগীতশিল্পীরা কনসার্টে লোক টানছেন—ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া বেসামরিক মানুষের প্রতি সহানুভূতি জাগাতে। চিকিৎসক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা মিনাব শহরে প্রার্থনা সভা আয়োজন করেছেন—দক্ষিণ ইরানের এই শহরে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র একটি স্কুলে আঘাত হেনে ১৬০-এর বেশি শিশুকে হত্যা করেছে, যাদের সবাই স্কুলছাত্রী।
আমেরিকা ও ইসরায়েল যখন লক্ষ্যবস্তুর তালিকা সামরিক ঘাঁটি থেকে জাতীয় অবকাঠামোর দিকে প্রসারিত করছে, তখন নির্বাসিতদের মধ্যে দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—নিজ দেশে বোমায় নিহত ১,৫০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিকের তুলনায় তিনি নিহত আমেরিকান সেনাদের প্রতি বেশি সহানুভূতি দেখিয়েছেন।
সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তার মধ্যে স্বৈরাচারী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এই বিভক্ত বিরোধীদলের একটি অংশ ভিন্ন পথে এগোতে শুরু করেছে। গত ২৮শে মার্চ লন্ডনে ইরানের রাজনৈতিক, জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর একটি বিস্তৃত জোট ‘ইরান ফ্রিডম কংগ্রেস’ চালু করে। এই জোট আমেরিকা ও ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলছে।
সমাবেশে বক্তারা তেল স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার নিন্দা জানান। একজন বক্তা বলেন, এই যুদ্ধ একটি বিপর্যয়, যা শাসকগোষ্ঠীকে আরও শক্তিশালী করেছে—ঠিক তখনই, যখন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেশকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।
আরেকজন সংগঠক মন্তব্য করেন, “শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এভাবে হওয়া উচিত নয়—এটি একটি ইরানি প্রকল্প হওয়া উচিত, ইসরায়েলি নয়।” কেউ কেউ বিশ্বের শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ নিয়েও গর্ব প্রকাশ করেছেন।
সমাবেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা তুলে ধরতে রাজতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক পতাকা একসঙ্গে প্রদর্শন করা হয়। কুর্দি ও বালুচ প্রতিনিধিদের উপস্থিতি করতালিতে স্বাগত জানানো হয়।
তবে এই ঐক্যের প্রচেষ্টা সহজ নয়। রেজা পাহলভির সমর্থকেরা নতুন কংগ্রেসের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন এবং এটিকে বামপন্থী ও গোপনে শাসকগোষ্ঠী-সমর্থকদের জমায়েত বলে অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষের কণ্ঠস্বর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতাকার অনুপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে—যার ওপর আল্লাহর উদ্দেশে উৎসর্গ লেখা রয়েছে।
এমনকি একটি প্রতিবেদনও পুনঃপ্রচার করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়—এই গোষ্ঠীকে ইসরায়েল-সমর্থক প্রচারকেরা তুলে ধরছে। যুদ্ধকে ঘিরে মতবিরোধ এতটাই তীব্র যে চূড়ান্ত বিবৃতিতে এ বিষয়ে কোনো উল্লেখই রাখা হয়নি।
এই পরিস্থিতি শাসকগোষ্ঠীর জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। রেজা পাহলভি ও তার বিদেশি সমর্থকেরা যে ধারাবাহিক গণবিক্ষোভের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং প্রতি রাতে শহরের চত্বরে শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে।
তবে যুদ্ধ শেষ হলেও আয়াতুল্লাহদের সামনে কঠিন প্রশ্ন থেকেই যাবে। অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন আরও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় আবারও বিক্ষোভ দেখা দিতে পারে—যেমনটি ঘটেছিল ইসরায়েলের সঙ্গে শেষ সংঘর্ষের ছয় মাস পর। তবে ভবিষ্যতে যদি তা ঘটে, তখন ইরানিরা একটি ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক বিরোধীদলের পেছনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু সেই নেতৃত্ব এখনো সুস্পষ্টভাবে গড়ে ওঠেনি।