চলমান যুদ্ধে ইরান অপ্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পরও ইরান ভেঙে পড়েনি। বরং তারা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এ কারণে এখন পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ইরানকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল “অপারেশন এপিক ফিউরি” নামে একটি যৌথ হামলা চালায়। প্রথম ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৯০০টি আক্রমণ করা হয়। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই প্রথম দফার হামলাতেই আলি খামেনেই নিহত হন।
তবে এরপর ইরান ভিন্ন কৌশল নেয়। সরাসরি সামরিক লড়াইয়ের বদলে তারা যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকে নিয়ে যায়। ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালীর ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ে, যা ইরানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করে।
হরমুজ প্রণালী হলো পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর-এর মাঝখানে একটি সরু জলপথ। এর প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এই পথের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম সপ্তাহেই ইরান ড্রোন ও পানির নিচের হামলা চালিয়ে এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে—
- অনেক দেশে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেয়, এমনকি রেশনিং শুরু হয়
- বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়
- জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে
অনেক বিশ্লেষক ভেবেছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালী বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না। খুব দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এটি নিজেদের দখলে নেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং এই অবস্থান ইরানের জন্য নতুন ধরনের শক্তি তৈরি করেছে।
সহজভাবে নতুন বাস্তবতা:
১. আলোচনায় বসতে বাধ্য করা: এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো ইরানের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছে।
২. অর্থনৈতিক চাপ তৈরি: তেলের সরবরাহে প্রভাব ফেলে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারছে।
৩. আঞ্চলিক চাপ বাড়ানো: ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বাব এল-মান্দেব প্রণালীতেও চাপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। শুরুতে তিনি ইরানের সাধারণ মানুষকে সরকার পরিবর্তনের জন্য উৎসাহ দেন। কিন্তু পরে তিনি নিকোলাস মাদুরো-এর উদাহরণ টেনে বলেন, তিনি আসলে সহযোগিতামূলক একটি শাসনব্যবস্থা দেখতে চান।
৫ মার্চ তিনি এক্সিওস-কে জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় তিনি প্রভাব রাখতে চান। তিনি আলি খামেনেই-এর ছেলে মোজতাবা খামেনেই-কে এই পদে “গ্রহণযোগ্য নয়” বলেও উল্লেখ করেন।
তবে ইরানের এসেম্বেলী অব এক্সপার্টস শেষ পর্যন্ত মোজতাবাকেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেয়। এতে বোঝা যায়, ইরান তাদের সিদ্ধান্তে পশ্চিমা চাপকে গুরুত্ব দেয়নি।
লেবানন:ইসরায়েল ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিজবুল্লাহর মধ্যে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ২৪ মার্চ ঘোষণা দেন, তারা দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকা দখল করতে চায়। এটি অনেকটা ১৯৮২ সালের ঘটনার মতো।
সাইপ্রাস: হিজবুল্লাহ একটি ড্রোন হামলা চালায়, যা গিয়ে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে আঘাত করে। এতে বোঝা যায়, সংঘাত এখন ভূমধ্যসাগর অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে।
গাল্ফ দেশগুলো: সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে মার্কিন দূতাবাস ও সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এতে এসব দেশের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
- রাশিয়া: মিত্র দেশ ইরানের পাশে সরাসরি যুদ্ধে নামতে চায়নি, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কড়া সমালোচনা করেছে।
- স্পেন: ন্যাটোর সদস্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি। এতে ট্রাম্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
- ওমান: দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আনার চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধ এখনো চলছে, আর কবে শেষ হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইরান যদি হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা ভিন্ন ধরনের শক্তির অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে পুরোপুরি জয় না পেলেও কৌশলগতভাবে তারা লাভবান হতে পারে।
বিশ্লেষক রবার্ট এ. পেপে মনে করেন, এই যুদ্ধ আমাদের নতুন একটি বাস্তবতা দেখাচ্ছে। আগে শক্তি মানে শুধু সামরিক ক্ষমতা বোঝাতো। কিন্তু এখন ভৌগোলিক অবস্থান আর অর্থনৈতিক প্রভাবও বড় শক্তি হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ, একবিংশ শতাব্দীতে কে কতটা শক্তিশালী—তা শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে নয়, বরং কৌশল, অবস্থান আর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দিয়েও নির্ধারিত হচ্ছে।