ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা, ইরানের ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পূর্বঘোষিত “সভ্যতার মৃত্যু” হুমকি থেকে সরে এসে ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। এর পরপরই তেহরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (SNSC) এক বিবৃতিতে এই চুক্তিকে “ঐতিহাসিক বিজয়” হিসেবে দাবি করেছে।

ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার শর্তে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হচ্ছে।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে।

তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, “এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়—আমাদের হাত এখনো ট্রিগারের ওপর রয়েছে।”

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে উল্লেখিত প্রধান দাবিগুলো হলো—

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা
যুক্তরাষ্ট্রের অঞ্চলীক সামরিক ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান প্রত্যাহার
সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
পরমাণু সমৃদ্ধিকরণের স্বীকৃতি
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আইএইএ’র সব প্রস্তাব বাতিল
ইরানের ক্ষতিপূরণ প্রদান
বিদেশে জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্তি
“প্রতিরোধের অক্ষ” (হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি) বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ
একটি বাধ্যতামূলক জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাবনার মাধ্যমে চুক্তির বৈধতা
১০ নিরাপত্তামূলক নৌ-চলাচল প্রোটোকল প্রতিষ্ঠা

ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়—

“শত্রু তার নির্লজ্জ, অবৈধ এবং অপরাধমূলক যুদ্ধে এক অবিসংবাদিত, ঐতিহাসিক এবং চূড়ান্ত পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে।”

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানকে জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই ১০ দফা পরিকল্পনাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

তবে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আলোচনা চলবে “মার্কিন পক্ষের প্রতি সম্পূর্ণ অবিশ্বাস” রেখেই।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। WTI ক্রুডের দাম ১৮ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯২.৬০ ডলারে নেমে আসে।

তবে উদ্বেগ রয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও বুধবার ভোরে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-এ ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা জারি করা হয়। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এর পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়—যা বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ।

মঙ্গলবার সকালে ট্রাম্প হুমকি দেন, “আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতার মৃত্যু ঘটবে”—যদি কোনো সমঝোতা না হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন।

ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা সফল হলে, এটি ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব-এর পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হতে পারে।

তবে দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাস এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য অসন্তোষ এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *