সরকার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায়নি—বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হলো, দেশের তেলবাজারে অস্থিরতার মূল কারণ সরকারের সিদ্ধান্ত নয়, বরং কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কারসাজি।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর পূর্বাচলে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, “সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি, বাজারে যারা বাড়িয়েছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।” তার এই বক্তব্যের সঙ্গে মিলে গেছে মাঠপর্যায়ের তথ্য—বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কয়েক দফায় বেড়ে গেলেও তেলের আমদানিতে শুল্ক বা কর কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
ব্যবসায়ীদের গোপন কারসাজি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি টনে ১,০৭০ ডলার থেকে নেমে এসেছে ৯৬০ ডলারে। একই সময়ে দেশে লিটারপ্রতি দাম বেড়েছে গড়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা। প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে কেন বাড়ছে?
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় চারটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান—এসিআই, সিটি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ ও ফিনিক্স গ্রুপ—দেশের বাজারে কার্যত একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। তারা সমন্বিতভাবে দাম নির্ধারণ করে এবং বাজারে ‘ঘাটতির’ নাটক সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করে।
বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা নিয়মিত বাজার তদারকি করি, কিন্তু ব্যবসায়ীরা কাগজে কলমে সব ঠিক রাখে। তারা মজুত করে পরে বাজারে ‘স্বল্প সরবরাহ’ দেখিয়ে দাম বাড়ায়।”
সরকারের ঘোষণা বনাম বাস্তবতা
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, সরকার তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অটল। বরং তিনি বলেন, “যারা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে বাজারে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে। রাজধানীর মিরপুরের এক গৃহিণী বললেন, “সরকার বলছে দাম বাড়ায়নি, কিন্তু দোকানে গিয়ে দেখি আগের তেল ১৯০ টাকার জায়গায় এখন ২০৫ টাকা লিটার।”
বাজারে এই দামের অযৌক্তিক বৃদ্ধি শুধু সাধারণ ক্রেতাদেরই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত করছে ছোট ব্যবসায়ীদেরও। এক রেস্টুরেন্ট মালিক জানান, “প্রতিদিন এক ড্রাম তেল লাগে, এখন সেটা কিনতে ১,২০০ টাকার বেশি খরচ হয়। দাম বাড়লে খরচ সামলানো মুশকিল।”
অপরাধমূলক মুনাফার সংস্কৃতি
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ভোজ্যতেল বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ‘কৃত্রিম ঘাটতি’ ও ‘মনোপলি ব্যবসা’ চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজুর রহমান বলেন,
“সরকার দাম ঠিক রাখলেও বাজারে ব্যবসায়ীরা একযোগে সিন্ডিকেট করে। এটা মুক্তবাজার অর্থনীতির অপব্যবহার—যেখানে ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নেয়।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি নীতিমালা প্রয়োগের দুর্বলতা এবং বাজার মনিটরিংয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে এই চক্র বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছে।”
সমাধান কোথায়?
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, তারা বাজার মনিটরিং জোরদার করবে এবং প্রয়োজনে অভিযান চালাবে। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু অভিযান নয়—প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
‘কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’–এর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন,
“যতদিন পর্যন্ত বড় কোম্পানিগুলোর আর্থিক লেনদেন ও মজুত ব্যবস্থাপনা প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য করা না হবে, ততদিন এই দুষ্টচক্র চলতেই থাকবে।”
সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি—এটা সত্য। কিন্তু বাস্তবে তেলের বোতল যখন প্রতিদিন একটু একটু করে দামি হয়ে উঠছে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়—রাষ্ট্রের নীতিতে নয়, বাজারে সক্রিয় সিন্ডিকেটের হাতেই রয়েছে নিয়ন্ত্রণ।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়, তবে ‘অঘোষিত ব্যবসায়ী সরকার’ই চালাবে দেশের তেলবাজার—আর তার বোঝা বইবে সাধারণ মানুষ।