ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা : ‘ইঞ্চি’ দূরত্বে থাকা একটি চুক্তির ভাঙন

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের মাত্র “কয়েক ইঞ্চি” দূরত্বে ছিল তেহরান। কিন্তু অন্যায্য দাবি, লক্ষ্য পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নৌ অবরোধের কারণে সেই আলোচনা ভেস্তে গেছে।

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু আলোচনার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটিতে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে আলোচনা পুনরায় শুরু হয়।

গত ৭ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার অংশ নেন। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ।

আরাগচি তার এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে লিখেছেন: “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গত ৪৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইরান দেখিয়েছে যে তারা যুদ্ধ শেষ করতে আন্তরিক। কিন্তু ইসলামাবাদে চুক্তি সই করার মুহূর্তে এসেও আমাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে চরমপন্থী দাবি, শর্ত পরিবর্তন এবং অবরোধের। কিছুই শেখা হলো না। ভালো মনোভাব ভালো মনোভাব জন্ম দেয়, আর খারাপ মনোভাব খারাপ মনোভাব জন্ম দেয়।”

আরাগচির এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) ঘোষণা দেয় যে ১৩ এপ্রিল সকাল ১০টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ইরানের সব বন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়া সব জাহাজের উপর অবরোধ আরোপ করা হবে।

CENTCOM-এর বিবৃতিতে বলা হয়:  “এই অবরোধ আরব উপসাগর ও ওমান উপসাগরে ইরানের সব বন্দর এবং উপকূলীয় এলাকায় নিরপেক্ষভাবে সব দেশের জাহাজের জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অ-ইরানি বন্দরে যাওয়া জাহাজের নৌ-চলাচলের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া হবে না।”

ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত লক্ষ্য পরিবর্তন করেছে। মার্কিন প্রশাসন ইরানের কাছে তিনটি প্রধান পরমাণু স্থাপনা (ফোরদো, নাতানজ ও ইসফাহান) ধ্বংস এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছিল।

অন্যদিকে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি দাবি করেছিলেন যে ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ শূন্য করতে এবং আইএইএ-র সম্পূর্ণ পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে রাজি হয়েছে।

এই ব্যর্থ আলোচনার পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। ইরান হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং মার্কিন নৌবাহিনী সেখানে মাইন পরিষ্কার অভিযান শুরু করেছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরাইল দাবি করছে যে লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়—যা ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের একটি ক্ষেত্র।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে ইরানের উপর “সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ” আরোপ করা হবে। দুই পক্ষের মধ্যে গভীর অনাস্থা এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মৌলিক মতবিরোধের কারণে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্পাদনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরাগচির “ইঞ্চি দূরত্বের” মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলেও পক্ষগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের অভাব এবং সর্বোচ্চপন্থী অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।

সূত্র: Al Mayadeen, Firstpost, Wikipedia, Council on Foreign Relations, এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *