ইসমাইল সালাহউদ্দিন
আজকের ভারতের সকাল শুরু হয় দুই রকম খবর দিয়ে। এক খবর চলে টেলিভিশনের পর্দায়—যেখানে পাকিস্তান, হিন্দু গৌরব আর “নতুন ভারত” নিয়ে সাজানো বিতর্ক চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আরেকটা খবর আছে, যা পর্দায় দেখা যায় না—কিন্তু সত্যি। সেটা হলো প্রতিদিনের মুসলমান নিপীড়ন: কোথাও পিটিয়ে হত্যা, কোথাও হয়রানি, কোথাও মিথ্যা মামলায় জেল, কোথাও অপমান। এই দুই খবরের ফারাকেই লুকিয়ে আছে ভয়ানক এক বার্তা—মুসলমানের কষ্ট হয় মুছে ফেলা হয়, নয়তো সেটাকেই বানানো হয় জনতার বিনোদন। যেন মুসলমান মানেই আসামি—চিরদিন অভিযুক্ত, চিরকাল নীরব।
গত সেপ্টেম্বর আজমগড়ে সাত বছরের এক মুসলিম ছেলেকে খুন করা হলো। তার দেহ ব্যাগে ভরে ফেলা হয়েছিল। প্রতিবেশীরা খুঁজে পেলেও খবরটা জাতীয় টেলিভিশনে জায়গা পেল না। এক মুহূর্তের জন্য কিছু স্থানীয় সংবাদে এলেও দ্রুত হারিয়ে গেল “লাভ জিহাদ”, সীমান্ত উত্তেজনা বা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের শিরোনামের নিচে। এক মুসলিম শিশুর মৃত্যু কোনো “জাতীয় ক্ষোভ”-এর উপকরণ নয়, তাই সেটি নিঃশব্দে চাপা পড়ল। সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন বলেছিলেন—কিছু সমাজে নৃশংসতাকে আর লুকানো হয় না, এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যায় যে সেগুলো আর কাউকে নাড়া দেয় না। আজকের ভারত ঠিক তেমনই—দিনদুপুরে মুসলমানদের হত্যা করা হয়, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ তাকিয়ে থাকে নির্লিপ্তভাবে।
কিন্তু ঘৃণা কেবল নীরবতা নয়, তা এক অভিনয়ও। কানপুরে যখন মুসলমানরা “আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি” লেখা প্ল্যাকার্ড তুলে দাঁড়ালেন, পুলিশ তাদের রক্ষা না করে ১,৩০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিল, বহুজনকে গ্রেপ্তার করল। ভালোবাসার প্রকাশকেই বানানো হলো অপরাধ। অথচ যখন মহারাষ্ট্র বা মধ্যপ্রদেশে হিন্দুত্ববাদীরা প্রকাশ্যে গণহত্যার ডাক দেয়, টেলিভিশনের ক্যামেরা হয় তাদের মহিমা দেখায়, নয়তো ঘুরে যায় অন্যদিকে। আজকের ভারতে মুসলমানের বিরুদ্ধে সহিংসতা এক রকমের নাট্যাভিনয়—যেখানে মুসলমান চিরকাল আসামির চরিত্রে, আর হিন্দুত্ববাদীরা সভ্যতার রক্ষক সেজে অভিনয় করে।
এই নির্বাচিত দৃশ্যমানতা ইচ্ছে করেই তৈরি করা হয়। যেমন, ইন্দোরে “জিহাদি-মুক্ত বাজার” চালুর নামে এক রাতে মুসলিম ব্যবসায়ীদের দোকান উচ্ছেদ করা হলো। বহু পরিবার এক মুহূর্তে রাস্তায়। সন্তানদের স্কুল ছাড়তে হলো, মা-বোনেরা খাবারের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরল। কিন্তু জাতীয় গণমাধ্যম এটাকে বলল “আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ব্যবস্থা”—মানুষের যন্ত্রণা তাদের কাছে খবর নয়। উল্টো, হিন্দুত্ববাদীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় উৎসব করল, মুসলমানদের উচ্ছেদকে বানাল ভাইরাল মিম। যা হওয়া উচিত ছিল জাতির লজ্জা, তা পরিণত হলো দৈনন্দিন বিনোদনে।
এই সংস্কৃতির মুখপাত্রদের একজন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তিনি প্রকাশ্যে মুসলমানদের বলেন “অনুপ্রবেশকারী”, “সন্ত্রাসের প্রতি সহানুভূতিশীল”। এরা কোনো প্রান্তিক কণ্ঠ নয়, এরা শাসকশ্রেণি। বিরোধীরাও চুপ, তারা কেবল হিন্দুত্বের হালকা সংস্করণ হাজির করে ভোটের মাঠে। সবাই মিলে বানিয়ে ফেলেছে এক রাজনৈতিক বাস্তবতা—ভারতে মুসলমান এখন আর রাজনৈতিক নাগরিক নয়, সে কেবল সাজানো নাটকের একটি প্রপস।
এই বাস্তবতার ভার শুধু দেহে নয়, মনে, অস্তিত্বেও। আজকের ভারতে মুসলমান মানে চির সন্দেহভাজন—মসজিদে প্রার্থনা করলে নজরদারি, বাজারে গেলে সন্দেহ, ক্লাসে গেলেও প্রশ্ন। জুমার নামাজ আজ ঝুঁকি, আজানের ধ্বনি যেন কারও কাছে উস্কানি। কবি সাহির লুধিয়ানভি একসময় লিখেছিলেন, “যাদের গর্ব ভারতের ওপর, তারা আজ কোথায়?” প্রশ্নটা আজও জাগে—যদি এ-ই ভারতের গৌরব হয়, তবে কেন প্রতিদিন মুসলমানের অপমানই তার প্রমাণ?
উগান্ডায় জন্ম নেওয়া মুসলিম চিন্তাবিদ মাহমুদ মামদানি বলেছিলেন, রাষ্ট্র ও সমাজ মুসলমানদের ভাগ করে “ভালো মুসলমান” আর “খারাপ মুসলমান”-এ। ভারতে সেই ভাগ প্রতিদিন নতুনভাবে প্রয়োগ হয়। যে মুসলমান চুপ থাকে, নিজের পরিচয় লুকায়, সে নিরাপদ। যে নিজের ধর্মে গর্ব করে, নিজের অধিকার চায়, সে মুহূর্তে হয়ে যায় “মুজরিম”—অপরাধী। মামদানি বলেন, এটি ধর্মের বিষয় নয়, এটি ক্ষমতার প্রশ্ন—কার হাতে বৈধতার সংজ্ঞা, আর কার কাঁধে সন্দেহের ভার।
তাই আজ লিঞ্চিংয়ের ভিডিও ঘোরে হোয়াটসঅ্যাপে, টিভি সঞ্চালকরা হাসতে হাসতে বলেন “মুসলমান জনসংখ্যা বিস্ফোরণ” নিয়ে গল্প, আর দোকান পুড়লে জনতা তালি দেয়। ঘৃণা এখন রাজনীতি নয়, এক ধরনের সম্মিলিত বিনোদন। যখন নিষ্ঠুরতা হয় হাসির বিষয়, অপমান হয় প্রাইমটাইমের স্ক্রিপ্ট—তখন গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে রেখাটা মুছে যায়।
ইতিহাস বারবার সাবধান করেছে—যে সমাজ সংখ্যালঘুর যন্ত্রণা থেকে আনন্দ নেয়, সে শেষ পর্যন্ত নিজেও রক্ষা পায় না। নাৎসি জার্মানির উদাসীন নাগরিকরা, আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ হত্যায় চুপ থাকা শ্বেতাঙ্গরা, কিংবা গাজার বোমাবর্ষণে উল্লাসিত ইসরাইলিরা—সবাই দেখেছে, ঘৃণার বিনোদন একদিন পুরো সমাজকেই গ্রাস করে। ভারতও এর বাইরে নয়।
তাই প্রশ্ন ফিরে আসে—আমরা মুসলমান, না মুজরিম? কেন প্রতিদিন বিচারাধীন হয়ে বাঁচতে হবে, যখন খুনিরা ঘুরে বেড়ায় মুক্তভাবে? কেন আমাদের শিশুর মৃত্যু খবর হয় না, অথচ রাষ্ট্র উদ্যাপন করে “অমৃত কাল”? এর উত্তর শুধু মুসলমানদের নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়দেরও দিতে হবে—তারা কি ঘৃণার নাটক দেখে হাততালি দিতে থাকবে, না একদিন টিভির পর্দা বন্ধ করবে?
কারণ যেদিন ঘৃণাই হয়ে উঠবে জাতির একমাত্র বিনোদন, সেদিন পর্দায় ভেসে উঠবে কেবল মুসলমানের লাশ নয়—ভেসে উঠবে প্রজাতন্ত্রের মৃত্যুঘোষণা। ইতিহাস তখন আর জিজ্ঞেস করবে না আপনি হিন্দু না মুসলমান, ডানপন্থী না উদারবাদী। সে জিজ্ঞেস করবে—একটা সভ্য সমাজ কীভাবে নিষ্ঠুরতাকে হাসির খোরাক বানিয়ে ফেলল, আর নীরবতাকে করল সম্মতির ভাষা।
আজ যদি আপনি তালি দেন মুসলমানকে অপরাধী বানানোর নাটকে, কাল আপনি দেখবেন, যে রাষ্ট্রকে আপনি সমর্থন করেছিলেন, সেই রাষ্ট্রই হয়ে উঠেছে আপনার কারাগার। আর তখন এই প্রজাতন্ত্রে ভেসে বেড়াবে কেবল এক শব্দ—ঘৃণার হাসি।
সূত্র : আল জাজিরা
ইসমাইল সালাহউদ্দিন
লেখক ও গবেষক, দিল্লি ও কলকাতাভিত্তিক
ইসমাইল সালাহউদ্দিন দিল্লি ও কলকাতায় বসবাসকারী এক লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে মুসলিম পরিচয়, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, জাতিভেদ এবং জ্ঞানের রাজনীতির প্রশ্ন। তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে ‘সামাজিক বঞ্চনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি’ বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে দ্য ওয়্যার, মিডল ইস্ট মনিটর, স্ক্রল, আউটলুক ইন্ডিয়া, মুসলিম মিররসহ নানা পত্রপত্রিকায়।