বিলম্বিত আলোয় নভেরা

ফ্রান্সের মিউজে দ্য নভেরা-তে রাষ্ট্রদূত মো. তালহা স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৫ হস্তান্তর করছেন নভেরা আহমেদের স্বামী গ্রেগোয়ার দ্য ব্রুহন্সের হাতে।

ফ্রান্সের এক শান্ত শহরে, ছোট্ট এক জাদুঘরের ভেতর ঝুলছে মাটির গন্ধমাখা ভাস্কর্য, কাগজে আঁকা রেখার মৃদু প্রতিচ্ছবি। জায়গাটার নাম— মিউজে দ্য নভেরা। এখানে নীরবে বেঁচে আছেন বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের অগ্রদূত নভেরা আহমেদ।

সেই জাদুঘরের দেয়ালে যুক্ত হলো একটি নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারটি নভেরার নামে ঘোষণা করা হয়েছিল। অবশেষে পুরস্কারটি নভেরার স্বামী ফরাসি শিল্পী ও স্থপতি গ্রেগোয়ার দ্য ব্রুহন্স এর কাছে হস্তান্তর করেন ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. তালহা।

অল্প কিছু মানুষ, কিন্তু মুহূর্তটি যেন ইতিহাসের এক নীরব সংশোধন— বাংলাদেশের এক পথপ্রদর্শক নারীকে দেরিতে হলেও রাষ্ট্রের সম্মান জানানোর মুহূর্ত।

ঢাকা থেকে প্যারিস, মাটির স্পর্শে এক জীবন

নভেরা আহমেদ জন্মেছিলেন ১৯৩০ সালে, চট্টগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই আঁকা-গড়ার প্রতি টান ছিল তাঁর। পড়াশোনা করেছেন ঢাকায়, পরে চলে যান লন্ডন আর প্যারিসে। সেখানে বিখ্যাত ভাস্কর অঁতোয়ান বুরদেলের ছাত্রী হিসেবে গড়ে তোলেন নিজের শিল্পদৃষ্টি।
দেশে ফিরে এসে ষাটের দশকে তিনি তৈরি করেন এমন সব কাজ, যা সে সময়ের বাংলাদেশে প্রায় অকল্পনীয় ছিল। “অপরাজেয় বাংলা”-র প্রথম ধারণাটি তাঁর — মাটির মূর্তিতে ধরা পড়ে নারীর শক্তি, প্রতিরোধ আর জীবনবোধ।

তাঁর কাজের ভাষা ছিল নীরব, কিন্তু গভীর। রাজনীতি বা প্রচারণা থেকে দূরে থেকেও তিনি হয়ে ওঠেন সময়ের সাক্ষী।

অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, তারপর পুনরাবির্ভাব

১৯৭৩ সালে নভেরা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান ফ্রান্সে। এর পরের চার দশক তিনি ছিলেন প্রায় অদৃশ্য— না ছিলেন সংবাদে, না ছিলেন আলোচনায়। তবু ফ্রান্সের দক্ষিণে তাঁর ও স্বামীর তৈরি ছোট্ট বাড়িটাই হয়ে ওঠে এক নিভৃত শিল্পকেন্দ্র।
তিনি ভাস্কর্য করতেন, ছবি আঁকতেন, কখনও পাথরে, কখনও কাঠে। কিন্তু দেশে ফিরে তাঁর প্রদর্শনী হয়নি আর কোনোদিন।

২০১৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই বছরই গ্রেগোয়ার দ্য ব্রুহন্স তাঁর স্মৃতিতে গড়ে তোলেন মিউজে দ্য নভেরা— ছোট কিন্তু আন্তরিক একটি জাদুঘর, যেখানে সংরক্ষিত আছে তাঁর বহু অজানা কাজ, নোট, আর ড্রয়িং।

দেরিতে আসা সম্মান

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে বহু বছর ধরেই দাবি উঠেছিল, নভেরা আহমেদের মতো একজন শিল্পী রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার যোগ্য। অবশেষে ২০২৫ সালে সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে— বাংলাদেশের শিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে।
যদিও তিনি আর বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিই যেন সেই সম্মানের সাক্ষী হয়ে রইল।

রাষ্ট্রদূত তালহা পুরস্কারটি হস্তান্তর করার সময় বলেন,

“নভেরা আহমেদ শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের ভিত্তি। আজকের এই মুহূর্ত আমাদের দায়মুক্তি নয়, বরং গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।”

গ্রেগোয়ার দ্য ব্রুহন্সের চোখে তখন অশ্রু। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,

“নভেরা আজ বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই হাসতেন। তাঁর শিল্প আজও বাংলাদেশের হৃদয়ে কথা বলে।”

ভুলে থাকা থেকে ফিরে আসা

নভেরার গল্পটা একরকম প্রতীকও বটে— দেশের বাইরে থাকা, অবহেলায় হারিয়ে যাওয়া, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসা। তাঁর শিল্প যেমন মাটির গন্ধে ভরা, তেমনি জীবনের প্রতিটি ভাস্কর্যে ধরা আছে বাংলাদেশের স্পর্শ।

ফ্রান্সের ছোট্ট সেই জাদুঘরে যখন বাংলাদেশের পতাকা উড়ল, তখন মনে হচ্ছিল— বহু বছর পর যেন এক শিল্পীকে তাঁর দেশ ফিরে ডাকছে।
একজন নারী, যিনি নিজের জীবনকে গড়েছিলেন পাথর, কাঠ আর মাটির ভেতর দিয়ে, অবশেষে ফিরে পেলেন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

মিউজে দ্য নভেরার দেয়ালে এখন একটি নতুন ফলক ঝুলছে—
“Novera Ahmed (1930–2015): Independence Award, Bangladesh, 2025.”

মৃদু আলোয় ঝলমল করছে সেই ফলক। বাইরে শরতের নরম হাওয়া।
নভেরা হয়তো হাসছেন—
যেভাবে তিনি একসময় বলেছিলেন, “শিল্প মানে মাটি ছুঁয়ে থাকা। যদি সে মাটি হারায়ও, তবু তার গন্ধটা থেকে যায়।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *