অবৈধ সিমের খেলা: নজরদারির ফাঁক কোথায়?

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট সেবা, সরকারি-বেসরকারি যোগাযোগ সবকিছুই নির্ভর করছে মোবাইল সিমের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে অবৈধভাবে একাধিক সিম ইস্যুর অভিযোগ উঠেছে দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে।

এনআইডি জালিয়াতি ও গ্রাহকের ভোগান্তি

অনেক গ্রাহক অবাক হয়ে দেখছেন—তাদের এনআইডির বিপরীতে একাধিক সিম নিবন্ধিত, অথচ তারা সেসব সিম কেনেননি। গ্রাহকের অজান্তে এই বাড়তি সিম ইস্যু হওয়া কেবল প্রতারণাই নয়, বরং মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে মোতালেব মিয়া বা মো. ইব্রাহিমের মতো বহু গ্রাহকের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে—যেখানে তারা বছরের পর বছর একটি সিম ব্যবহার করলেও, হঠাৎ করেই নিজেদের নামে আরও ৬-৭টি সিম যুক্ত হতে দেখছেন।

অপরাধের ঝুঁকি কার ঘাড়ে?

প্রশ্ন উঠছে—যদি সেই বাড়তি সিম দিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম বা অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে দায় নেবে কে? এনআইডির প্রকৃত মালিক, না-কি সিম ইস্যুকারী কোম্পানি? আইনের ফাঁকফোকর আর কোম্পানিগুলোর দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিরীহ গ্রাহকদেরই আইনি জটিলতায় ফেলতে পারে।

কোম্পানিগুলোর উদাসীনতা

বিভিন্ন কাস্টমার কেয়ারে গেলে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা কোনো সদুত্তর পাচ্ছেন না। বরং দায়িত্বগ্রহণের পরিবর্তে কোম্পানিগুলো গ্রাহককেই ডি-অ্যাকটিভেশনের ঝামেলায় ফেলে দিচ্ছে। অনেকে অভিযোগ করছেন, কাস্টমার কেয়ার বন্ধ থাকায় বা ঝুলিয়ে রাখায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এ অবস্থায় সাধারণ গ্রাহকের মধ্যে আতঙ্ক ও অস্থিরতা বাড়ছে।

সরকারি উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা

বিটিআরসি সম্প্রতি এসএমএস পাঠিয়ে জানিয়েছে, একজন গ্রাহকের নামে ১০টির বেশি সিম থাকলে অতিরিক্ত সিম ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এর মধ্যে ডি-রেজিস্টার করতে হবে। সিমের লিস্ট পেতে দেওয়া হয়েছে *১৬০০১# কোড। তবে এই ঘোষণার পরই সাধারণ মানুষ এনাইডি দিয়ে চেক করে বিস্ময়ে দেখছেন, অচেনা সিম নম্বর তাদের নামে নিবন্ধিত হয়ে আছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে এনআইডির অপব্যবহার করে সিম বিক্রির এ বাণিজ্য চলেছে।

ভোক্তা অধিকার আইন কার্যকর নয়

২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে আইনি জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এ আইন কার্যকর নয় বললেই চলে। টেলিকম খাতে প্রভাবশালী অপারেটরদের অব্যবস্থাপনা এবং দায় এড়ানোর প্রবণতাই বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।

সাধারণ মানুষের দাবি

গ্রাহকদের মতে, এনআইডির বিপরীতে প্রকৃত মালিকানার বাইরে থাকা সব অবৈধ সিম অবিলম্বে ডি-অ্যাকটিভ করতে হবে। একই সঙ্গে অপারেটর কোম্পানিগুলোকে এনআইডির নিরাপত্তা রক্ষায় কঠোরভাবে দায়বদ্ধ হতে হবে। নতুবা সিম বাণিজ্যের এই অস্থিরতা শুধু গ্রাহকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অবহেলার কারণে প্রতিদিন লাখো গ্রাহক চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন। এনআইডির মতো ব্যক্তিগত গোপন নথি যদি সুরক্ষিত না থাকে, তবে নাগরিকের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? এখনই সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। নয়তো মোতালেব মিয়া বা ইব্রাহিমের মতো নির্দোষ মানুষই হয়ে উঠবেন কর্পোরেট অনৈতিকতার বলি।

প্রতিবেদন : মারুফ আহমেদ

One thought on “অবৈধ সিমের খেলা: নজরদারির ফাঁক কোথায়?

  1. সাধারণ একজন নাগরিকের আইডি দিয়ে দুইটি সিম সর্বোচ্চ রেজিস্টার করতে পারবে ।
    আর বিকাশ সহ অর্থনৈতিক লেনদেন যারা করেন এবং বিশেষ কিছু নাগরিকের জন্য শর্ত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিম পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনের সীমাবদ্ধতা রেখে নীতি নির্ধারণ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *