রূপপুরে পারমাণবিক শক্তির ভবিষ্যৎ দেখলেন এমইফাইয়ের অধ্যাপকরা


নভেম্বরের এক রোদেলা সকালে পাবনার ইশ্বরদী। পদ্মার ধারে বিশাল এক নির্মাণযজ্ঞ—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আকাশে উড়ছে ধুলো, কংক্রিটের গন্ধে ভরে আছে বাতাস। এমন সময় রূপপুরে পৌঁছান রাশিয়ার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় MEPhI এর অধ্যাপকরা। তাঁদের চোখে স্পষ্ট কৌতূহল—কীভাবে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে, তা নিজের চোখে দেখবেন আজ।

তাঁরা এসেছিলেন এক ভিন্ন উদ্দেশ্যে—বাংলাদেশে আয়োজিত “Exact Energy” অলিম্পিয়াডের চূড়ান্ত পর্বে বিচারক ও পরামর্শক হিসেবে। কিন্তু সুযোগ পেলেন আরও বড় কিছু দেখার—বাংলাদেশের পরমাণু স্বপ্নের মঞ্চ।
প্রকল্প এলাকার মূল ফটক পার হয়ে তাঁরা যখন ঢুকলেন, তখন রাশিয়ার ও বাংলাদেশের পতাকা পাশাপাশি দুলছে। প্রকল্প কর্মীরা তাঁদের হাতে হেলমেট ও নিরাপত্তা ভেস্ট তুলে দিলেন। সবাইকে স্বাগত জানালেন রূপপুর এনপিপির দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা।

প্রথমে নিয়ে যাওয়া হলো রিঅ্যাক্টর ভবনের দিকে। সাদা রঙের বিশাল গোলাকার কাঠামো, যেন শক্তি ও বিজ্ঞানের প্রতীক। সঙ্গে ছিলেন স্টেশন-স্টাফরা, ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন—কীভাবে প্রতিটি ধাপ রাশিয়ার VVER-1200 প্রযুক্তি অনুযায়ী সাজানো হচ্ছে, কোথায় কন্ট্রোল রুম, কোথায় ভবিষ্যতের টারবাইন।
অধ্যাপক আলেকজান্ডার নাখাবভ, যিনি এমইফাইয়ের পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের উপপ্রধান, বিস্মিত হয়ে বলেন,

“আমরা বহু সাইটে গিয়েছি, কিন্তু এমন বিদেশি নির্মাণ প্রকল্প খুব কমই দেখা যায়। এই সংগঠিত কাজ, পরিকল্পনা ও নিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসনীয়।”

তাঁদের চোখে পড়ল তরুণ বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের নিষ্ঠা—রুশ ভাষায় লেখা নকশা হাতে নিয়ে তাঁরা ব্যস্ত ব্যাখ্যা করছেন স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে। কেউ কেউ অনুশীলন করছে ভাষা, কেউ আঁকছে ডায়াগ্রাম—একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে পারমাণবিক দক্ষতার পথে।

রূপপুর শুধু এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি রাশিয়া ও বাংলাদেশের প্রযুক্তি-সহযোগিতার প্রতীক। Rosatom ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের যৌথ প্রকল্পটি দুই দেশের মধ্যে এক নতুন ধরণের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিনিময় তৈরি করেছে।
এমইফাই, যা রাশিয়ার পারমাণবিক শিক্ষার কেন্দ্র, বহু বাংলাদেশি ছাত্রকে ইতিমধ্যেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে—কেউ পড়ছে রিয়্যাক্টর ফিজিক্স, কেউ নিউক্লিয়ার সেফটি।
অধ্যাপকদের এই সফর যেন সেই সহযোগিতার জীবন্ত রূপ। তাঁরা দেখলেন, তাঁদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই এখন রূপপুর প্রকল্পের মেরুদণ্ডে কাজ করছে।

শিক্ষার আলো থেকে শক্তির আলো

সাইট পরিদর্শন শেষে অতিথিরা বললেন, এটি কেবল এক নির্মাণ নয়, এক পাঠশালা। এখানে ভবিষ্যৎ প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা শিখছেন কীভাবে বিশাল এক যন্ত্র মানবকল্যাণে রূপ নিতে পারে।
একজন অধ্যাপক মৃদু হাসলেন, “এই জায়গা থেকে যে শক্তি বের হবে, তা শুধু আলো জ্বালাবে না, এটি নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসও জ্বালাবে।”

বাংলাদেশের জন্য এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়—এটি প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতীক।
রূপপুরের প্রতিটি ইট-সিমেন্টে মিশে আছে দেশের আত্মনির্ভরতার গল্প। আর এই সফর ছিল সেই গল্পের এক অধ্যায়, যেখানে রুশ শিক্ষকরা সাক্ষী হলেন বাংলাদেশের পারমাণবিক যাত্রার।

সন্ধ্যার দিকে অধ্যাপকরা বিদায় নিলেন। পদ্মার পাড়ে হালকা হাওয়া বইছে, পেছনে সূর্য লাল হয়ে নামছে দিগন্তে। তাঁরা গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন,

“রূপপুর শুধু বাংলাদেশ নয়, আমাদেরও গর্বের প্রকল্প।”

বাংলাদেশের পরমাণু শক্তির এই অধ্যায় হয়তো এখনো অসম্পূর্ণ, কিন্তু সেই দিনের সফর প্রমাণ করে—এই গল্পের দিকনির্দেশনা সঠিক পথে এগোচ্ছে।
রূপপুরের কংক্রিটে শুধু পরমাণু রিয়্যাক্টর নয়, জেগে উঠছে এক নতুন বিশ্বাস—জ্ঞান, সহযোগিতা ও ভবিষ্যতের শক্তিতে ভর করে গড়ে ওঠা এক দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *