বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। সরকার চীন থেকে ২০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এসব ইঞ্জিন পুরোপুরি অনুদান হিসেবে দিতে রাজি হয়েছে চীন। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ রেলওয়ে এ বিষয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। রেলওয়ের প্রত্যাশা, আগামী দুই বছরের মধ্যেই এই ইঞ্জিনগুলো এসে পৌঁছাবে।
রেলওয়ের বর্তমান বহর
বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও ইন্দোনেশিয়াসহ নয়টি দেশের ইঞ্জিন রয়েছে। তবে চীন থেকে এখনো কোনো ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হয়নি। অতীতে দেশটি থেকে বেশ কয়েক দফায় কোচ আমদানি করা হলেও ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ এবারই প্রথম। অনুদানের ইঞ্জিনগুলো যুক্ত হলে চীন হবে রেলের ইঞ্জিন সরবরাহকারী দশম দেশ।
রেলওয়ের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বহরে বর্তমানে যে সংখ্যক ইঞ্জিন রয়েছে তার একটি বড় অংশই বয়সে প্রাচীন এবং কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। অনেক ইঞ্জিন ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নিয়মিত মেরামত ব্যয় বাড়ছে, একইসঙ্গে ট্রেন চলাচলে ঘন ঘন ব্যাঘাত ঘটছে। নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হলে যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীন সরকার এ উদ্যোগকে তাদের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের অংশ হিসেবে দেখছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এর মাধ্যমে শুধু রেলওয়ে নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ-চীন অবকাঠামোগত সহযোগিতা আরও গভীর হবে।
আর্থিক প্রেক্ষাপট
২০টি মিটারগেজ ইঞ্জিনের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বাংলাদেশকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। চীন সরকার এটি সম্পূর্ণ অনুদান হিসেবে দেবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন উদার প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন লাভজনক, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে চীনা প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীলতাও তৈরি করতে পারে।
রেলওয়ের চ্যালেঞ্জ
ইঞ্জিন পাওয়া গেলে রেলওয়ের পরিচালন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে ঠিকই, তবে টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা ও দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। অতীতে দেখা গেছে, বিদেশি নির্মাতাদের অনেক ইঞ্জিন খুচরা যন্ত্রাংশের সংকট ও প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন অকেজো অবস্থায় পড়ে থেকেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অনুদানের ইঞ্জিন আনার পাশাপাশি রেলওয়ের উচিত নিজস্ব কারখানা ও মেরামত সক্ষমতা বাড়ানো। নইলে অনুদাননির্ভরতা টেকসই সমাধান দেবে না।
কৌশলগত গুরুত্ব
চীন থেকে এ ধরনের অনুদান শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চীন যে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে, এর মধ্য দিয়েই তা স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। রেলওয়ের নতুন প্রকল্পটি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
চীন থেকে ২০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন অনুদান পাওয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশের রেল খাতে নতুন গতি আনবে—এতে সন্দেহ নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কেবল অনুদান বা আমদানিনির্ভর হয়ে না থেকে রেলওয়েকে দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভর হওয়ার পথ খুঁজতে হবে। চীনের ইঞ্জিন যুক্ত হলে বহর বৈচিত্র্যময় হবে, যাত্রীসেবা উন্নত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ ও প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতার প্রশ্নও রেলওয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।