২০১১ সালের ৫ জুন ঢাকার ধানমণ্ডিতে ঘটে যাওয়া নৃশংস হামলা আজও অনেকের মনে তীব্র দুঃখ ও ক্ষোভ জাগায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মনজুর সেদিন স্বামী হাসান সাইদ সুমন-এর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দেওয়া এবং নাক–মুখে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
ঘটনার সময় রুমানার পাঁচ বছরের মেয়ে বাসায় উপস্থিত ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে পরে হত্যা চেষ্টার মামলা করা হয়। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়, আর জিজ্ঞাসাবাদের সময় সুমন হত্যাচেষ্টার কথা স্বীকারও করেন।
মারাত্মক আঘাতে রুমানা দুই চোখের দৃষ্টি হারান। প্রথমে ঢাকায় চিকিৎসা হলেও দৃষ্টিশক্তি আর ফিরেনি। পরে তাঁকে কানাডার ভ্যাংকুভারে নেওয়া হয়। সেখানে একাধিক অস্ত্রোপচার হলেও ফল ইতিবাচক ছিল না—শেষ পর্যন্ত তিনি স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যান।
এই ঘটনা দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হয়। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার (UBC) শিক্ষার্থীরা রুমানার সমর্থনে র্যালিও করেন। পরবর্তীতে সুমনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দায়ের করা হয়।
অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্যেও রুমানা থেমে যাননি। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রেইল শিখে নেন এবং সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি UBC থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে কঠোর পরিশ্রমে ২০১৭ সালে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন।
রুমানার ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক সম্মান বা পেশাগত সাফল্যও অনেক সময় নারীদের পরিবারিক সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে পারে না। তাঁর গল্প বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। একই সঙ্গে কমিউনিটির সহায়তা, আইনি সুরক্ষা এবং সচেতনতার গুরুত্বও তুলে ধরে।
কানাডার লেখিকা ডেনিস চং তাঁর জীবনের গভীর বর্ণনা তুলে ধরেছেন Out of Darkness বইয়ে। সেখানে শুধু নির্যাতনের অভিজ্ঞতাই নয়, রুমানার পুনর্গঠন, শিক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারও উঠে এসেছে।
রুমানা মনজুরের জীবন ট্র্যাজেডি দিয়ে শুরু হলেও শেষ হয়নি। তিনি সংগ্রামের মধ্যেই নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত কোনো গল্প নয়—এটি গৃহনির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাজের জন্য এক জাগরণ।
রুমানার দৃঢ় মনোবল ও এগিয়ে যাওয়ার সাহস আজও অনেক নারীকে অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়—যত অন্ধকারই হোক, লড়াই থামলে নয়; আলো খুঁজে পাওয়া যায় স্থির বিশ্বাস ও সমর্থনের শক্তিতে।