চীনের স্বর্ণ কৌশলে চাপে পড়েছে ডলার

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এক নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে। বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের আধিপত্য দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য আনতে ক্রমশ স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে। আর এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে চাইছে চীন।

চীনের গোল্ড কৌশল

চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ছয় মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কিনছে। বর্তমানে চীনের স্বর্ণ মজুদ ২,৩০০ টন ছাড়িয়েছে। যদিও এ পরিমাণ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক কম—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভে রয়েছে ৮,৫০০ টনের বেশি স্বর্ণ।

তবে চীনের লক্ষ্য শুধু নিজের ভাণ্ডার ভরাট করা নয়। দেশটি এখন বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জের (Shanghai Gold Exchange) মাধ্যমে বুলিয়ন কেনার আহ্বান জানাচ্ছে। পরিকল্পনা হলো, এসব দেশ যেন তাদের রিজার্ভের একটি অংশ চীনের এক্সচেঞ্জে কিনে চীনেই সংরক্ষণ করে।

এ উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে চীন কার্যত বিশ্বের “স্বর্ণের অভিভাবক” বা গার্ডিয়ান হয়ে উঠতে পারে।

রিটেইল ও কমার্শিয়াল ব্যাংকিংয়ে সোনার প্রসার

শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, চীনা সরকার দেশটির বাণিজ্যিক ও খুচরা ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকদের কাছে স্বর্ণে সঞ্চয়ের অফার প্রচার করতে বলছে। তাদের যুক্তি—ডলার দুর্বল হচ্ছে। গ্রিনব্যাকের মূল্য ধীরে ধীরে কমছে, ফলে সঞ্চয় যদি স্বর্ণে রাখা যায় তবে তা অনেক নিরাপদ।

গত কয়েক বছরে স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, চাহিদা আরও বাড়ায় সামনের দিনে এর দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে।

বৈশ্বিক প্রবণতা

শুধু চীন নয়, বিশ্বের বহু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে রিজার্ভ পোর্টফোলিওতে স্বর্ণের অনুপাত বাড়াচ্ছে। ২০২২ সালের পর থেকে রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। কারণ তারা আশঙ্কা করছে, ডলার ও ইউরোসহ প্রধান মুদ্রাগুলো মুদ্রাস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ থাকবে না।

ব্রিকস ও বিকল্প মুদ্রা চিন্তা

এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ব্রিকস জোটের (BRICS) মুদ্রা পরিকল্পনা। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই জোটের সদস্য, এবং সম্প্রতি নতুন কিছু দেশও যুক্ত হয়েছে। আলোচনা চলছে, যদি ব্রিকস কোনো যৌথ মুদ্রা আনে এবং সেটি স্বর্ণের সাথে পেগ (peg) করে, তবে বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে তখন কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হবে। বিশেষ করে যদি উন্নয়নশীল ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো ব্রিকস মুদ্রা গ্রহণে আগ্রহ দেখায়, তবে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

চীনের লক্ষ্য স্পষ্ট—শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থাতেও প্রভাব বিস্তার করা। স্বর্ণভিত্তিক রিজার্ভ ব্যবস্থায় চীন যদি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য আমেরিকা থেকে এশিয়ার দিকে সরে আসতে শুরু করবে।

তবে এ যাত্রা সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো, আর্থিক বাজারের গভীরতা, ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থা এখনো দৃঢ়। কিন্তু চীনের স্বর্ণ-কেন্দ্রিক কৌশল প্রমাণ করছে যে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে—যেখানে স্বর্ণ আবারও “চূড়ান্ত মুদ্রা” হিসেবে ফিরে আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *