মাত্র ২৭ দিনেই পদত্যাগ ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীর

 

 

প্যারিস, ৬ অক্টোবর ২০২৫ (ফ্রান্স২৪, রয়টার্স ও এপি):
দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ২৭ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। মাত্র ১৩ ঘণ্টা আগে নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণা করে টুইটে আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরদিন সকালেই রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন লেকর্নু।

এই অল্প সময়ের মধ্যে এমন পদত্যাগ ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়—বরং চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে ফ্রান্স

মাসের পর মাস ধরে ফ্রান্স রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুলাইয়ের সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশটিতে কোনো দল পূর্ণসংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলস্বরূপ, তৈরি হয় একটি “হ্যাং পার্লামেন্ট”, যেখানে বামপন্থী জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট (NUPES), অতিডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি (National Rally) এবং ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী দল রেনেসাঁ (Renaissance)—তিন দিক থেকেই তীব্র ক্ষমতার টানাপোড়েন চলছে।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে লেকর্নুকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন ম্যাক্রোঁ। তরুণ এই নেতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন “গভীর পরিবর্তনের সূচনা” করবেন। কিন্তু মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যেই তাকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হলো।

কেন পদত্যাগ?

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব এবং নতুন বাজেট অনুমোদনে ব্যর্থতার আশঙ্কাই মূলত লেকর্নুর পদত্যাগের কারণ।
রয়টার্স জানিয়েছে, মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই বিভিন্ন দল নতুন সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়। কেউ অভিযোগ তোলে, নতুন মন্ত্রিসভায় কোনো বাস্তব পরিবর্তন ঘটেনি; পুরনো মুখই ঘুরে এসেছে।

এক টুইট বার্তায় লেকর্নু বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে সহযোগিতা করতে রাজি নয়। এই পরিস্থিতিতে কার্যকর সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়।”
এর পরপরই তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

বাম-ডান দুই শিবিরের দাবিতে উত্তাপ

লেকর্নুর পদত্যাগের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বামপন্থী France Unbowed (LFI) নেতা জঁ লুক মেলেনশোঁ প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর ইমপিচমেন্ট দাবি করেছেন।
তিনি বলেছেন, “এটি রাষ্ট্রপতির নীতির ব্যর্থতা। জনগণের ইচ্ছা উপেক্ষা করে দেশকে অচল করে রাখা হয়েছে।”

অন্যদিকে অতিডানপন্থী নেতা মেরিন লা পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবি জানিয়ে বলেন, “এখন সময় এসেছে জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়ার।”

রাজপথে বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক সংকট

ফ্রান্সের অর্থনীতি বর্তমানে প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে। বাজেট ঘাটতি বেড়েছে, কর্মবাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর ডাকা লাগাতার ধর্মঘট ও রাজপথে বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
রবিবার রাতেই প্যারিসের প্লেস দে লা রিপাবলিকে হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে সরকারের পতনের দাবিতে বিক্ষোভ করে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয় কয়েক জায়গায়।

ম্যাক্রোঁর সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এখন নতুন প্রধানমন্ত্রীর সন্ধানে। ফরাসি সংবিধান অনুযায়ী, তিনি চাইলে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনও দিতে পারেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তা করলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে। বর্তমানে প্রেসিডেন্টের দল সংসদে সংখ্যালঘু অবস্থানে, ফলে পরবর্তী নির্বাচনেও ফল তার বিপক্ষে যেতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় বাজারে ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। ইউরোর মান কমেছে, এবং শেয়ারবাজারে পতন দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি কোন পথে?

ফ্রান্সের রাজনীতিতে বর্তমানে দুটি পথ খোলা—
সমঝোতার মাধ্যমে নতুন মধ্যপন্থী সরকার গঠন
অথবা সংসদ ভেঙে পুনর্নির্বাচন আয়োজন

কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ম্যাক্রোঁর জন্য পথ কঠিন। ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষ, রাজপথে উত্তেজনা এবং বিরোধী দলের ঐক্য—সব মিলিয়ে ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র এখন এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সঙ্কটের মুখে।

ফ্রান্সের রাজনীতিতে এমন অনিশ্চয়তা গত এক দশকে দেখা যায়নি। লেকর্নুর পদত্যাগ কেবল এক ব্যক্তির পরাজয় নয়—এটি একটি যুগের প্রশ্ন, যেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরেই বিশ্বাস, আস্থা ও নেতৃত্বের সংকট গভীর হয়ে উঠছে।
এখন নজর সবারই এক জায়গায়—রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *