বিসিবিতে রাজনীতির আগুন

 

বাংলাদেশে ক্রিকেট আজ শুধু একটি খেলা নয়; এটি রাজনীতি, ক্ষমতা ও জাতির মানসিক অবস্থা বোঝার এক অনন্য আয়না। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাম্প্রতিক দখলদারি ও দলীয় প্রভাব নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটি যেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠান দখলের সংস্কৃতিরই ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। বিসিবিকে ঘিরে ক্ষমতার এই প্রতিযোগিতা শুধু খেলাধুলার ভবিষ্যৎ নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চরিত্রের ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

‘হাওয়া ভবনের’ টেবিল থেকে বাকশালী বোর্ডরুম

বাংলাদেশে ক্রিকেট প্রশাসনের ইতিহাস মূলত দলীয় নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস। বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন বিসিবি ছিল হাওয়া ভবনের রাজনৈতিক উপশাখা। কোচ নিয়োগ, সিলেকশন কমিটি, এমনকি বিদেশ সফরের অনুমোদন—সবই যেত রাজনৈতিক অনুমোদনের মধ্য দিয়ে।

পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে চিত্র বদলায়, কিন্তু চরিত্র বদলায় না। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে বিসিবি হয়ে উঠেছিল একধরনের “অঘোষিত বর্ধিত মন্ত্রিসভা”—যেখানে দক্ষতার চেয়ে আনুগত্যই ছিল নির্বাচনের মানদণ্ড। “বাকশালীয় মনোভাব” ক্রিকেটেও প্রবেশ করেছিল—দলীয় ভাই-বোন, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী বা প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকরাই প্রভাবশালী পদে বসতেন।

অর্থাৎ, আওয়ামি লীগ বা বিএনপি—উভয়ের কাছেই ক্রিকেট ছিল ক্ষমতার একধরনের মুদ্রা।

নতুন মুখ, পুরোনো চাল

বিএনপি এখন আবার ক্রিকেট প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে—তামিম ইকবালের মতো জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের সামনে রেখে। “বাকশালী দখলদারিত্ব থেকে মুক্তি”র স্লোগান তারা ব্যবহার করছে, কিন্তু এই স্লোগানের আড়ালে মূল কৌশলটি আগের মতোই—পুরোনো পৃষ্ঠপোষকদের বদলে নতুন পৃষ্ঠপোষক বসানো।

তামিম ইকবাল নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল ক্রিকেটার। কিন্তু তিনি যদি মনে করেন যে ফরচুন বরিশালের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি চালানো এবং বিসিবির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া একই ব্যাপার, তবে সেটা বিপজ্জনক সরলীকরণ।
বিসিবি হলো এমন এক জায়গা যেখানে খেলাধুলা, অর্থনীতি, আমলাতন্ত্র ও কূটনীতি মিলেমিশে থাকে। এখানে জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন প্রশাসনিক প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক ভারসাম্য ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।

জনপ্রিয়তা যখন দিশাহীনতার মুখোশ হয়

তামিমকে সামনে রেখে বিএনপির পরিকল্পনা একধরনের জনপ্রিয়তাবাদের দৃষ্টান্ত। এটি রাজনৈতিক শক্তি নয়, বরং কৌশলগত শূন্যতার ইঙ্গিত দেয়। দলীয় নীতিনির্ধারকরা—মীর্জা আব্বাস, আমির খসরু বা তাদের সহযোগীরা—পুরোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও বিতর্কিত আর্থিক মহলের সঙ্গে নতুন করে সেতুবন্ধন তৈরি করছেন।
এর মধ্যে যেমন আছেন লুৎফর রহমান বাদলের মতো শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযুক্ত, তেমনি আছেন অতীতের ব্যর্থ প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা।

এক তরুণ বিএনপি-সমর্থক বুদ্ধিজীবীর মন্তব্যেই বিষয়টি স্পষ্ট—

“বুলবুল বেশি সৎ, ফারুক ছিল বেশি টেকনিক্যাল, কিন্তু তামিমকে ব্র্যান্ড করা যায়।”

এই কথাটি বিএনপির আজকের রাজনীতির মর্মকথা বলে দেয়—নীতি নয়, মার্কেটিং-ই এখন কৌশল।

দক্ষিণ এশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতার রোগ

বাংলাদেশ একা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই ক্রিকেট রাজনীতির হাত থেকে মুক্ত নয়।
ভারতের বোর্ড (বিসিসিআই) একসময় ছিল রাজনৈতিক প্রভাবের দুর্গ। শারদ পাওয়ার, অনুরাগ ঠাকুর, অরুণ জেটলি—প্রায় সবাই ছিলেন সক্রিয় রাজনীতিক। কিন্তু ২০১৬ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের লোধা সংস্কার বাধ্যতামূলক করে টার্ম লিমিট, স্বার্থসংঘাত নিরোধক ও স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন করতে।

অন্যদিকে পাকিস্তান ঠিক বিপরীত পথে হাঁটল। প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই পিসিবির চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়। ফল—অদক্ষতা, অস্থিরতা ও খেলোয়াড়দের আস্থাহীনতা।
বাংলাদেশ এখন সেই দুই পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে—ভারতের মতো পেশাদার কাঠামো বানাবে, নাকি পাকিস্তানের মতো রাজনৈতিক রোটেশন চালিয়ে যাবে।

কী মধু বিসিবিতে

বিসিবির বার্ষিক বাজেট এখন প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি (প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার)
এখানে রয়েছে কর্পোরেট স্পনসরশিপ, টেলিকম কোম্পানি, ব্যাংক, বিদেশি টিভি অধিকার—সবকিছু মিলিয়ে একটি বিশাল অর্থনীতি।
এই অর্থনৈতিক বলয় রাজনীতিকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
একদিকে এটি কর্পোরেট অনুদানের উৎস, অন্যদিকে গণমাধ্যমে দৃশ্যমান থাকার হাতছানি। ফলে বিসিবি নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু ক্রিকেট নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ।

সংস্কারের অর্থ আসলে কী?

সংস্কার মানে শুধু মুখ বদল নয়, কাঠামো বদল।
বাংলাদেশ চাইলে নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মডেল অনুসরণ করতে পারে, যেখানে বোর্ডের ৬০% সদস্য নির্বাচিত হয় আঞ্চলিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে এবং ৪০% মনোনীত হয় স্বাধীন মনোনয়ন কমিটির মাধ্যমে। এতে রাজনৈতিক প্রভাব কমে, স্বচ্ছতা বাড়ে।

তামিম, বুলবুল বা ফারুক—যেই আসুক না কেন, যদি এই পুরনো কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তবে সবাই একই দুষ্টচক্রে আটকে যাবে।

একটি জাতির নৈতিক আয়না

২০১১ সালে যখন বাংলাদেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তখন ক্রিকেট ছিল জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। চৌদ্দ বছর পর সেই প্রতীক আজ কলুষিত রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্রিকেট বোর্ড বাঁচানো মানে শুধু খেলাধুলা রক্ষা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পুনর্জাগরণ।

বাংলাদেশের জন্য সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *