টিকটকের সাম্প্রতিক মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে পরিবর্তনের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, প্ল্যাটফর্মটির নিয়ন্ত্রণ যদি কার্যত আমেরিকান করপোরেট বা রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় চলে যায়, তাহলে কিছু নির্দিষ্ট মতাদর্শ—বিশেষ করে ফিলিস্তিনপন্থি কন্টেন্ট—ভবিষ্যতে কঠোর সেন্সরশিপের মুখে পড়তে পারে।
এই উদ্বেগ একেবারে নতুন নয়। এর আগেও মার্কিন নীতিনির্ধারকরা টিকটকের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন-সমর্থিত বার্তা বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবহারকারী বিকল্প প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন। আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে নতুন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ ‘আপস্ক্রোলড’ (UpScrolled)। প্ল্যাটফর্মটি প্রতিষ্ঠা করেছেন ফিলিস্তিনি-জর্ডানীয়-অস্ট্রেলীয় উদ্যোক্তা ইসাম হিজাজি। তিনি একজন ফিলিস্তিনি-অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ নেতা।
ইসাম হিজাজির ব্যক্তিগত জীবনও এই উদ্যোগের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন অনেকে। গাজার চলমান সহিংসতায় তার বৃহত্তর পরিবারের প্রায় ৬০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একপেশে কনটেন্ট মডারেশন নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে।
প্রযুক্তি পেশায় হিজাজির অভিজ্ঞতাও উল্লেখযোগ্য। তিনি আইবিএম, ওরাকল, হিটাচির মতো আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্টে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই তিনি আপস্ক্রোলডকে একটি “স্বচ্ছ ও ন্যায্য” ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চান।
আপস্ক্রোলড কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের প্ল্যাটফর্মে কোনো ধরনের ‘শ্যাডো ব্যান’ বা গোপনে পোস্টের রিচ কমিয়ে দেওয়ার মতো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা থাকবে না। ব্যবহারকারীদের কণ্ঠরোধ নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই তারা অগ্রাধিকার দিতে চান।
অন্যদিকে, টিকটকের নতুন অংশীদারদের নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেকের ধারণা, নতুন অংশীদারদের মধ্যে এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রয়েছেন, যারা ইসরায়েলপন্থি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী। ফলে সেখানে নিরপেক্ষ কনটেন্ট মডারেশন বজায় রাখা কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কাই ছড়িয়েছে।
এই আস্থার সংকটের মধ্যেই আপস্ক্রোলড দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিভিন্ন অ্যাপ স্টোরের তালিকায় এটি শীর্ষের দিকে উঠে এসেছে। ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ এটিকে নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং পক্ষপাতমুক্ত ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বাস ও স্বচ্ছতাই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। ব্যবহারকারীদের এই ঝোঁক দেখাচ্ছে, তারা কেবল প্রযুক্তি নয়—ন্যায়বিচার ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তাও চান। আপস্ক্রোলড সেই চাহিদা কতটা পূরণ করতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।