কাঁচা খেজুরের রসের আড়ালে নিপাহের আতঙ্ক: সীমান্ত জেলায় বাড়ছে উদ্বেগ

সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট

শীত এলেই বাঙালির ঘরে ঘরে ফেরে কাঁচা খেজুরের রসের আমেজ। ভোরের ঠান্ডায় সদ্য নামানো এই রস অনেকের কাছেই শীতের অপরিহার্য আনন্দ। কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী পানীয়ের আড়ালেই এখন লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক প্রাণঘাতী ঝুঁকি—নিপাহ ভাইরাস।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া এবং অন্তত ১১০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার খবরে বাংলাদেশেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার প্রায় ৭১ শতাংশ, যা একে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে।

কী এই নিপাহ ভাইরাস

ভাইরোলজির ভাষায় নিপাহ একটি প্যারামিক্সোভাইরাস। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম শনাক্ত হলেও বাংলাদেশে এর উপস্থিতি ধরা পড়ে ২০০১ সালে মেহেরপুরে। তখন থেকেই প্রায় প্রতি বছরই শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিপাহ সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হলো বাদুড়। আশ্চর্যের বিষয়, বাদুড় নিজে এই ভাইরাসে অসুস্থ হয় না। তবে তাদের লালা বা প্রস্রাবের মাধ্যমে খেজুরের রস, আধা খাওয়া ফল কিংবা পরিবেশ দূষিত হলে সেখান থেকে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় বাদুড় লোকালয়ে চলে আসছে, এতে মানুষের সংস্পর্শ বাড়ছে এবং ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।

কীভাবে ছড়ায় সংক্রমণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হলো কাঁচা খেজুরের রস। বাদুড় রাতের বেলায় গাছের হাঁড়িতে বসে রস খায় বা প্রস্রাব করে। অনেক সময় জাল দিয়ে হাঁড়ি ঢেকে রাখা হলেও তা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ জালের ওপর বাদুড় প্রস্রাব করলে সেটিও রসে মিশে যেতে পারে।

এ ছাড়া বাদুড় বা পাখির আধা খাওয়া ফল, সংক্রমিত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এবং তার লালা বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমেও নিপাহ ছড়াতে পারে।

লক্ষণ ও ঝুঁকি

রস খাওয়ার বা ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৩ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শুরুতে হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা দেখা যায়। এরপর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, প্রলাপ বকা, শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা ঝরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস তৈরি হয়, যা দ্রুত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আইইডিসিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশে নিপাহ আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এখনো এই ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই।

কী বলছেন চিকিৎসকরা

চিকিৎসকদের মতে, নিপাহের ক্ষেত্রে সচেতনতা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। কারণ চিকিৎসা সীমিত হলেও প্রতিরোধ সম্ভব। তারা স্পষ্ট করে বলছেন—কাঁচা খেজুরের রস কোনোভাবেই নিরাপদ নয়, অনলাইনে ‘নিরাপদ’ দাবি করে বিক্রি করা রস থেকেও দূরে থাকতে হবে।

কী করবেন, কী করবেন না

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—

  • কোনো অবস্থাতেই কাঁচা খেজুরের রস খাবেন না।
  • রস বা গুড় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভালোভাবে ফুটিয়ে নিলে ঝুঁকি থাকে না।
  • বাদুড় বা পাখির আধা খাওয়া ফল খাবেন না।
  • ফলমূল খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
  • নিপাহ আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে এলে মাস্ক ব্যবহার করুন এবং সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।

জরুরি পরামর্শ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত আইইডিসিআর বা স্বাস্থ্য বাতায়নের হটলাইনে যোগাযোগ করতে হবে।

শীতের আনন্দ যেন আতঙ্কে পরিণত না হয়—সেজন্য কাঁচা রসের লোভ সংযত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত। সচেতন থাকলেই নিপাহের মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসকে দূরে রাখা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *