মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হলো ডার্ক ম্যাটার। এই অদৃশ্য পদার্থকে সরাসরি দেখা যায় না, ধরা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব ছাড়া মহাবিশ্বের গঠন ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সেই রহস্য উন্মোচনের পথে এবার বড় এক ধাপ এগোল চীন।
চীনা বিজ্ঞানীদের একটি দল বিশ্বের প্রথম কোয়ান্টাম সেন্সর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের মূল লক্ষ্য—মহাবিশ্বের ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করা। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক সাময়িকী নেচার-এ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় জানানো হয়, পূর্ব চীনের হ্যফেই ও হাংচৌ শহরে অবস্থিত একাধিক পরীক্ষাগারকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। পরীক্ষাগারগুলোর মধ্যকার দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি। এত দীর্ঘ দূরত্বে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মাধ্যমে সেন্সর সংযুক্ত করার ঘটনা এই প্রথম।
সহজভাবে বললে, কোয়ান্টাম সেন্সর এমন এক ধরনের অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র, যা খুব ক্ষুদ্র পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারে। সাধারণ যন্ত্র যেখানে ব্যর্থ হয়, সেখানে কোয়ান্টাম সেন্সর কাজ করতে সক্ষম। একাধিক সেন্সরকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত করলে শনাক্তকরণের ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।
চীনা বিজ্ঞানীদের দাবি, এই নেটওয়ার্ক ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংকেত ধরতে পারবে। বিশেষ করে ডার্ক ম্যাটারের একটি কাল্পনিক কণা—অ্যাক্সিয়ন—এর উপস্থিতি খোঁজার কাজে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ হলো ডার্ক ম্যাটার। এর বাইরে প্রায় ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ হলো ডার্ক এনার্জি। অর্থাৎ, আমরা যে নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যালাক্সি দেখি—তা মহাবিশ্বের খুবই সামান্য অংশ।
ডার্ক ম্যাটার আলো বা ফোটন নিঃসরণ করে না। তাই সরাসরি চোখে দেখা বা টেলিস্কোপে ধরা যায় না। তবে গ্যালাক্সির ঘূর্ণনের গতি, নক্ষত্রের চলাচল এবং মাধ্যাকর্ষণের বিভিন্ন প্রভাব বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করেছেন।
গবেষকদের মতে, এই কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক শুধু ডার্ক ম্যাটার নয়, বরং মহাবিশ্বের তথাকথিত ‘হারানো ভর’ ব্যাখ্যাতেও সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও বিস্তৃত হলে ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়। তবে এই সাফল্য প্রমাণ করে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাবিশ্বের গভীর রহস্য অনুসন্ধানের নতুন যুগ শুরু হয়েছে।
ডার্ক ম্যাটার নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু পুরোনো। চীনের এই উদ্যোগ সেই কৌতূহলকে বাস্তব অনুসন্ধানে রূপ দেওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকল।