জাতীয় নির্বাচনের আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক মাহফুজ আলম মন্তব্য করেছেন, জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরস্পরের ‘অল্টার ইগো’। তার ভাষায়, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি দল টিকে থাকলে অন্যটিও থাকবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার প্রচারিত সাড়ে ১৪ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কারের অগ্রগতি, নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট ও স্বচ্ছ ভিশন বা পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। তার মতে, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একই রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ, যারা একে অপরের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে।
আসন্ন ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নিজে প্রার্থী না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের এই পারস্পরিক অস্তিত্বের বাস্তবতাই তার সিদ্ধান্তের মূল কারণ। তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণ শক্তিগুলোকে একত্র করে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় বিকল্প’ গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। তবে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এনসিপি যখন পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অংশ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যায়, তখন সেই উদ্যোগ ভেঙে পড়ে।
জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাদের সঙ্গে জোট করা হয়েছে তারা মূলত পুরোনো কাঠামোর অংশ। এ ধরনের জোট আদর্শিকভাবে নানা প্রশ্ন তৈরি করে, যার স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও আদর্শের জায়গা থেকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে জামায়াতের কোনো বাস্তবসম্মত মিল নেই।
ভবিষ্যৎ সরকার ব্যবস্থা নিয়েও সতর্কবার্তা দেন মাহফুজ আলম। তিনি বলেন, ক্ষমতায় যে দলই আসুক—বিএনপি বা জামায়াত—সমাজের ভেতরের ক্ষত সারাতে না পারলে কোনো সরকারই টিকবে না। শুধু কাগজে–কলমে সংস্কার যথেষ্ট নয়। ভিন্ন মত ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সমঝোতা তৈরি না হলে মব সহিংসতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। মাহফুজ আলম বলেন, মানুষের মধ্যে গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে গেছে। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে গণমাধ্যমকে তাদের অতীত ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনার জায়গায় আসতে হবে এবং দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে রাজনীতির বাইরে থাকা মাহফুজ আলম জানান, তিনি এখন সময় দিচ্ছেন বই পড়া এবং হতাশ তরুণদের সঙ্গে আলোচনায়। তার লক্ষ্য হলো, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কেন বাস্তবায়িত হয়নি—সেটি বোঝা এবং ভবিষ্যতে কীভাবে সামনে এগোনো যায়, সে বিষয়ে ভাবা।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। একই বছরের ২৮ আগস্ট মাহফুজ আলম প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১০ নভেম্বর উপদেষ্টা হন। তিনি গত বছরের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।