শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের নামে যে রূপান্তর ঘটছে, তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার। তিনি বলেছেন, শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজস্ব পরিচয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের মাল্টিপারপাস হলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান ঘাটতি ও অসংগতি পর্যালোচনায় গঠিত কমিটির খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. রফিকুল আবরার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন খাতে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের অবদান রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই খাতে যুক্ত ব্যক্তিদের শ্রম ও অবদান গভীরভাবে স্বীকার ও সম্মান করার কথাও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একটি ভিশন ডকুমেন্ট ও পরামর্শভিত্তিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা আরও সুসংহত করবে। আলোচনায় উত্থাপিত প্রতিবেদনগুলো কোনো নির্দিষ্ট সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়; বরং এগুলো একটি সমন্বিত আলোচনার ফল।
সরকারি দায়িত্ব শেষে আবারও নাগরিক সমাজভিত্তিক কর্মকাণ্ডে ফেরার প্রত্যাশা জানিয়ে ড. রফিকুল আবরার বলেন, এই দায়িত্ব তাঁকে নতুন কিছু ইস্যু ও প্ল্যাটফর্মে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের উত্থাপিত বিষয়গুলো ভবিষ্যতের নীতিগত আলোচনা ও অ্যাডভোকেসিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি জানান, এই আলোচনা কোনো সমাপ্তি নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ।
অনুষ্ঠানে ক্যাম্পের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের গবেষণা ও দাবি এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কেন শিশুরা শিখছে না, কেন শিক্ষকরা কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না এবং কেন পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না—এই প্রশ্নগুলোর অনেক উত্তর আলোচনায় উঠে এসেছে।
তিনি বিশেষভাবে মূল্যায়নব্যবস্থাকে শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এবারের প্রতিবেদনে শুধু সমস্যা নয়, সামনে এগোনোর দিকনির্দেশনাও তুলে ধরা হয়েছে, যা ইতিবাচক।
তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নের পথ তৈরি করা সম্ভব।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, শিক্ষা নিয়ে এসব আলোচনা নতুন নয়, তবে এবার বিষয়গুলো অনেক বেশি সুশৃঙ্খল, সামগ্রিক ও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এতদিন শিক্ষা নিয়ে আলোচনা ছিল খণ্ডিত; এই প্রতিবেদনে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির চেষ্টা দেখা গেছে।
তিনি আরও বলেন, বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনো শিক্ষা সংস্কারবান্ধব নয়। শিক্ষা সংস্কারের জন্য অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন, যা ভবিষ্যতে তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার অনন্ত নীলিম। এ সময় বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীসহ শিক্ষা খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।