বাংলাদেশ ডাক ব্যবস্থাকে আধুনিক, ডিজিটাল ও জনবান্ধব করতে নতুন আইন অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে প্রণীত এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১২৮ বছর পুরোনো ‘দ্য পোস্ট অফিস অ্যাক্ট, ১৮৯৮’ বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো চালু করা হচ্ছে।
নতুন অধ্যাদেশে বাংলাদেশ ডাকের ডিজিটাল রূপান্তর, ই-কমার্স কমপ্লায়েন্স, আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত উপাত্তের নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশনের কারণে ঠিকানা হারানোর বাস্তবতাও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ডাক, কুরিয়ার বা পার্সেল ব্যবসা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক জরিমানা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আগে এই জরিমানার সীমা ছিল ৫০ হাজার টাকা, আর পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকা।
নতুন আইনে প্রচলিত ডাকটিকিটের পাশাপাশি চালু করা হচ্ছে ডিজিটাল ডাকটিকিট বা ই-স্ট্যাম্পিং। গ্রাহক অনলাইনে বিল পরিশোধ করলে একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল কিউআর কোড বা বারকোড পাবেন। এটি প্রিন্ট করা কিংবা মোবাইল বা অন্য কোনো ডিভাইসে দেখানো হলেও আইনগতভাবে বৈধ ডাকটিকিট হিসেবে গণ্য হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর সব নীতি ও অধিকার ডাকসেবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অপারেটররা গ্রাহকের তথ্য শুধু সেবা প্রদানের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন। অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলতে হবে এবং সাইবার হামলা থেকে তথ্য রক্ষায় এনক্রিপশনসহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ই-কমার্স খাতের সুবিধার্থে একটি ডিজিটাল সেন্ট্রাল লজিস্টিক্স ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে সব বাণিজ্যিক অপারেটরের মধ্যে আন্তঃপরিচালন বা ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করা হবে, যাতে গ্রাহকরা এক জায়গা থেকেই সহজে পণ্য ট্র্যাকিং তথ্য জানতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ঠিকানা ব্যবস্থাপনায়। নতুন আইনে ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক নাগরিকদের ঠিকানা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। এর আওতায় ডিজিটাল অ্যাড্রেস তৈরি, ঠিকানাভিত্তিক ফ্যামিলি-ট্রি ম্যাপিং এবং জিও-ফেন্সিং নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকবে। এসব তথ্য নির্দিষ্ট লাইফ-সাইকেল অনুযায়ী ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন বা প্রাকৃতিক কারণে বসতি স্থানান্তরের ফলে ঠিকানা হারিয়ে গেলে—যেমন চর বিলীন হওয়া বা নতুন চর জেগে ওঠা—সে ক্ষেত্রে নতুন করে ঠিকানা চিহ্নিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ ২০২৬’ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ডাক শুধু চিঠি বা পার্সেল সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ডিজিটাল সেবা, ই-কমার্স ও নাগরিক তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি আধুনিক ও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে।