খাগড়াছড়ি জেলার মেরুং ইউনিয়ন—তিন পাহাড়ি জেলার অন্যতম দুর্গম এলাকা। এক সময় এই অঞ্চলে মাসিক স্বাস্থ্য ছিল নারীদের জন্য নীরব কষ্টের নাম। সচেতনতার অভাব, ব্যয়বহুল স্যানিটারি প্যাড এবং সামাজিক ট্যাবুর কারণে অনেক কিশোরী নিয়মিত স্কুলে যেতে পারত না। অস্বস্তি আর লজ্জার মধ্যেই দিন কাটাতেন অনেক নারী।
এখন সেই বাস্তবতা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কানাডা সরকারের অর্থায়নে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) বাংলাদেশের ‘উইমেন অ্যান্ড গার্লস এমপাওয়ারমেন্ট থ্রু ইনক্লুসিভ এডুকেশন’ (WGEIE) প্রকল্পের মাধ্যমে এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। পরিবর্তনের এই যাত্রায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় নারীরাই।
৩৭ বছর বয়সী জুলি চাকমা তাদের একজন। তিনি একজন রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ কেয়ার ওয়ার্কার (RHCW)। জুলি এখন তিন পাহাড়ি জেলার ১১৮ জন প্রশিক্ষিত নারীর একটি নেটওয়ার্কের অংশ। এই নারীরা ২৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য—মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং নিরাপদ স্যানিটারি প্যাড নারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এই কর্মসূচির আওতায় ব্যবহৃত হচ্ছে ‘স্বস্তি’ নামের স্যানিটারি প্যাড। এটি স্থানীয়ভাবে তৈরি, পরিবেশবান্ধব, বায়োডিগ্রেডেবল এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) অনুমোদিত। দামও তুলনামূলক কম, যা পাহাড়ি এলাকার নারীদের জন্য সহজলভ্য।
জুলি চাকমা শুধু প্যাড বিক্রি করেই থেমে থাকেন না। তিনি নিয়মিত স্কুল ও গ্রামে গিয়ে সেশন নেন। সেখানে তিনি মাসিকের সময় প্যাডের সঠিক ব্যবহার, সময়মতো পরিবর্তন এবং মাসিক স্বাস্থ্যর গুরুত্ব নিয়ে সে সম্পর্কে কথা বলেন।
জুলি বলেন, “আগে অনেক মেয়ে মাসিকের সময় স্কুলে যেত না। নারীরা চুপচাপ কষ্ট সহ্য করতেন। এখন তারা কথা বলছেন, প্রশ্ন করছেন। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে—আমার নিজেরও বাড়ছে।”
ভৌগলিক দুর্গমতা ও সাংস্কৃতিক বাধার কারণে পার্বত্য এলাকায় নারীরা দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। জুলির মতো কমিউনিটি-ভিত্তিক কর্মীরা এখন সেই শূন্যতা পূরণ করছেন। যেখানে এক সময় নীরবতা ছিল, সেখানে এখন তৈরি হচ্ছে সচেতনতা ও যত্নের সেতু।
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। পরিবহন ব্যয়, বাজার গ্রহণযোগ্যতা এবং দুর্গম এলাকায় নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা এখনো বড় সমস্যা। তারপরও কর্মসূচি এগিয়ে চলছে। কারণ মাসিক স্বাস্থ্য শুধু একটি স্বাস্থ্য বিষয় নয়—এটি শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
উৎস: UNDP বাংলাদেশ