জনগণের প্রশ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতা শোনা এবং তা বোঝার লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক সংলাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘অলটারনেটিভস’ তাদের প্রথম কর্মসূচি হিসেবে আয়োজন করে আলোচনা সভা— ‘জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ: আমাদের ব্যর্থতা ও নতুন দিনের দিশা’।
শনিবার (৭ই ফেব্রুয়ারী) সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মূল বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও নিপীড়নের সংস্কৃতি ভাঙার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কিছু আংশিক সংস্কারের বাইরে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। পুরোনো ব্যবস্থাই নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
মাহফুজ আলম তার বক্তব্যে জুলাই-পরবর্তী সময়ের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার একটি ধারাবাহিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিপ্লবোত্তর সময়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, শক্ত কাঠামোগত নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং জনগণের সঙ্গে জবাবদিহিমূলক সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়াই বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।
তার মতে, বিচারহীনতা অব্যাহত থাকা, বৈষম্যের ধারাবাহিকতা, পুরোনো প্রশাসনিক ও পুলিশি কাঠামোর টিকে থাকা, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সংকট—সব মিলিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো জনগণের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি গড়ে তোলা। একই সঙ্গে জুলাই প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষা, তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, হতাশা ও প্রশ্ন গুরুত্ব দিয়ে শোনার আহ্বান জানান তিনি। শ্রমিক, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তিকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখার কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘অলটারনেটিভস’ একটি রাজনৈতিক সংলাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কথা শোনা, তাদের প্রশ্ন ও অভিজ্ঞতা বোঝা এবং সেসবের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবনা গড়ে তুলতে কাজ করবে। এই আলোচনা সভার মধ্য দিয়েই সেই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো।
মূল আলোচনার পর অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে ডা. তাজনুভা জাবীন-এর সঞ্চালনায় রেজওয়ান আহমদে রিফাত, মহিদুল ইসলাম দাউদ, জাহিন ফারুক আমিন এবং মাহফুজ আলম সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল—কেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া জনগণ রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি এবং কীভাবে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংহতি তৈরি করা যেতে পারে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, এ ধরনের রাজনৈতিক সংলাপে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। জনগণের অভিজ্ঞতা ও প্রশ্নকে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন টেকসই হবে না বলেও তারা মনে করেন।
সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ঈমন সৈয়দ ও আব্দুল্লাহ মেহেদী দীপ্ত বলেন, দেশের সব শ্রেণি-পেশা ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংলাপের মধ্য দিয়েই একটি নতুন রাজনৈতিক পাটাতন তৈরি করা সম্ভব। তারা এই উদ্যোগে সবাইকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।