মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা নতুন প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা অত্যন্ত জরুরি। তারা যেন জানে—এই দেশ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে যুদ্ধ হয়েছে এবং কেন স্বাধীনতা অর্জন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা কেউ চিরস্থায়ী নই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকতে হবে। সামনে আরও সংগ্রাম আসতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ যেন সেই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকে।”

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।

বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া তিন সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মানুষের অগাধ শ্রদ্ধাকে কাজে লাগিয়ে অতীতে অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করেছে। রাজনৈতিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানকে খেলার পুতুল বানানো হয়েছিল। আমাদের চেষ্টা ছিল—এগুলোকে আবার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানো।”

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একটি পবিত্র দায়িত্ব। কয়েক বছরের মধ্যেই নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যাবে না, তাই তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য এখনই পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, আগের সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করেছে এবং সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, “অনেক মুক্তিযোদ্ধা এতে কষ্ট পেয়েছেন। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জঞ্জালমুক্ত করার চেষ্টা করছি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি।”

বৈঠকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ও গণভোট আয়োজনের জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। তাঁরা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না এবং সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।

গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে তা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে বলেও মত দেন মুক্তিযোদ্ধারা। ব্যক্তিগতভাবে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারেও অংশ নেওয়ার কথা জানান তাঁরা।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশ এখন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের একটি সুযোগ এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “সংস্কার না হলে আমরা ঘুরে ফিরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব। বের হওয়ার পথ থাকবে না।”

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকার জন্য তাঁরা কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অপ-রাজনীতির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাজে একঘরে করে ফেলা হয়েছিল।

বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধারা জানান, গত ১৬ বছরে তাঁদের সম্মান এতটাই ক্ষুণ্ন হয়েছে যে অনেক সময় পরিচয় দিতে সংকোচ বোধ করতেন। মানুষ প্রশ্ন করত—“আসল না নকল?”

ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা বলেন, দীর্ঘদিন পর দেশে বাকস্বাধীনতা ফিরেছে। তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণরা যেভাবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তারা মুক্তিযুদ্ধেরই উত্তরসূরি। একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা প্রতিহত করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বৈঠকে তিন সংগঠনের নেতারা তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিল এবং কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পদ যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, “এই সম্পদ দেশের স্থায়ী মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করতে হবে। সরকার যেমন কাজ করবে, তেমনি নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি সরকারে না থাকলেও নাগরিক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করে যাব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *