লেবাননের সংসদের স্পিকার নাবিহ বের্রি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ১০ মে অনুষ্ঠেয় সংসদীয় নির্বাচন নির্ধারিত সময়েই হবে। কোনো অবস্থাতেই তা পিছিয়ে দেওয়া হবে না।
এ ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশটি ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ সংঘাতের পর পুনর্গঠনের চাপে আছে এবং কিছু রাজনৈতিক দল নিরাপত্তা পরিস্থিতির অজুহাতে নির্বাচন স্থগিতের দাবি তুলছে।
দক্ষিণ লেবাননে চলমান নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা তুলে কয়েকটি মহল নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বের্রি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত তারিখে এবং বর্তমান আইন অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আইন সংশোধনের জন্য সংসদ অধিবেশন ডাকবেন না বলেও জানান তিনি।
বের্রি ১৯৯২ সাল থেকে টানা সাত মেয়াদে স্পিকারের দায়িত্বে আছেন। তিনি আমাল মুভমেন্ট-এর প্রধান এবং হিজবুল্লাহ-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেন, “নির্বাচন আয়োজনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আইনের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রবাসী লেবানিজদের ভোটাধিকার। ২০১৭ সালের নির্বাচনী আইনে প্রবাসীদের জন্য ছয়টি আসন নির্ধারিত ছিল। তবে ২০১৮ ও ২০২২ সালের নির্বাচনে তারা সব ১২৮ আসনের জন্য ভোট দিতে পেরেছিলেন।
এবার আবার পুরোনো বিধান কার্যকর করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রবাসীদের ভোটের পরিধি কমে যেতে পারে।
২০২২ সালের নির্বাচনে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ তিনগুণ বেড়েছিল। তাদের ভোটে ১৩টি আসনে পরিবর্তনপন্থী প্রার্থীরা জয় পান। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীরা ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক শক্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন, কারণ তাদের বড় অংশ অর্থনৈতিক সংকটে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া তরুণ প্রজন্ম।
লেবানিজ ফোর্সেস-সহ কয়েকটি দল চায় প্রবাসীরা আগের মতোই সব আসনে ভোট দিতে পারুক। তবে স্পিকার এ সংশোধনী এজেন্ডায় তুলছেন না, যা সংসদে অচলাবস্থা তৈরি করেছে।
নির্বাচন নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিল উত্থাপিত হয়েছে, যেখানে লেবাননের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যাহতকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া ফ্রান্সের বিশেষ দূত জঁ-ইভ লে দ্রিয়ান সতর্ক করেছেন, নির্বাচন স্থগিত হলে তা আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দেবে।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামও আন্তর্জাতিক অস্বস্তি এড়াতে সময়মতো নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে বলে জানা গেছে।
২০২৬ সালের এ নির্বাচন লেবাননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গত বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে জোসেফ আউনের নির্বাচন এবং নওয়াফ সালামের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পর দেশটির রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তনের আভাস মিলেছে।
২০২২ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪৯.২ শতাংশ। এতে জনগণের একাংশের আস্থাহীনতা প্রকাশ পায়। তবে একই নির্বাচনে কিছু সংস্কারপন্থী প্রার্থী জয়লাভ করেন এবং ঐতিহ্যবাহী জোটের শক্তি কমে আসে।
এবার প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন। দেশের ভেতরে নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ৪০ লাখ।
বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, স্পিকার নিরপেক্ষ না থেকে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন। তারা বলছেন, প্রবাসী ভোট সীমিত করা হলে ঐতিহ্যবাহী জোট লাভবান হবে।
অন্যদিকে বের্রি দাবি করেছেন, নির্বাচন বিলম্বের জন্য দায়ী কিছু রাজনৈতিক দল এবং সরকার, যারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মে মাসের নির্বাচন লেবাননের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এটি স্পষ্ট করবে, দেশটি পুরোনো শক্তির প্রভাবেই থাকবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোবে।