আইস ড্যান্সে স্বর্ণ পদক হারালেন চক-বেটস

শীতকালীন অলিম্পিকে ফিগার স্কেটিংয়ের আইস ড্যান্স ইভেন্ট শেষ হলো বিতর্কে। যুক্তরাষ্ট্রের তারকা জুটি ম্যাডিসন চক ও ইভান বেটস স্বর্ণপদক হারালেন মাত্র ১.৪৩ পয়েন্টের ব্যবধানে। কিন্তু এই হারের পেছনে এক ফরাসি বিচারকের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক স্কেটিং ইউনিয়ন (আইএসউ) দাঁড়িয়ে গেলেন বিচারকের পাশে।

মঙ্গলবার রাতে মিলান আইস স্কেটিং অ্যারেনায় চক-বেটস করেন তাদের ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্স। “পেইন্ট ইট ব্ল্যাক” সঙ্গীতে তাদের মাতাদোর-অনুপ্রাণিত কোরিওগ্রাফি দর্শকদের মুগ্ধ করে। প্রতিটি নড়াচড়ায় ছিল নিখুঁত সমন্বয়, প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল ১৫ বছরের পার্টনারশিপের পরিণতি।

কিন্তু তাদের পরেই আসা ফরাসি জুটি লরেন্স ফোর্নিয়ে বোদ্রি ও গিয়োম সিজেরোন “দ্য হোয়েল” সিনেমার সঙ্গীতে নিজেদের মেলে ধরেন। তাদের পারফরম্যান্সে ছিল কিছু ত্রুটি—বিশেষ করে টুইজল সিকোয়েন্সে সিজেরোনের একটি স্পষ্ট ভুল। তবুও ফলাফল এলো বিপরীতমুখী।

ফ্রি ড্যান্সে চক-বেটস পান ১৩৪.৬৭ পয়েন্ট, আর ফরাসি জুটি পান ১৩৫.৬৪। মোট পয়েন্টে ২২৫.৮২ বনাম ২২৪.৩৯—ফ্রান্স জিতল স্বর্ণ, যুক্তরাষ্ট্র সন্তুষ্ট হতে হলো রূপা নিয়ে।

বিতর্কের কেন্দ্রে ফরাসি বিচারক জেজাবেল ডাবুই। ফ্রি ড্যান্সে তিনি ফরাসি জুটিকে দেন ১৩৭.৪৫ পয়েন্ট, আর চক-বেটসকে মাত্র ১২৯.৭৪—প্রায় আট পয়েন্টের ব্যবধান! এই ব্যবধান এতটাই বড় যে, ডাবুইয়ের স্কোর বাদ দিলে চক-বেটসই স্বর্ণ জিততেন।

নয় বিচারকের মধ্যে পাঁচজন চক-বেটসকে প্রথম স্থান দিয়েছিলেন। তিনজন ফরাসি জুটিকে দিয়েছিলেন সরু ব্যবধানে। কিন্তু ডাবুইয়ের স্কোর ছিল চরম ব্যতিক্রম। এমনকি স্প্যানিশ বিচারক মার্তা ওলোজাগারেও চক-বেটসকে তৃতীয় স্থান দেন, কানাডার পাইপার গিলেস-পল পোয়ারিয়েরের পেছনে।

আরও উল্লেখযোগ্য, ডাবুই এর আগেও বিতর্কিত স্কোরিং করেছেন। গত ডিসেম্বরের গ্র্যান্ড প্রিক্স ফাইনালে যখন চক-বেটস ফরাসি জুটিকে হারান, তখন ডাবুই চক-বেটসকে দুটি পেনাল্টি সত্ত্বেও সামান্য এগিয়ে রেখেছিলেন। অলিম্পিকের রিদম ড্যান্সেও তিনি ফরাসি জুটিকে ৫.৭৪ পয়েন্টে এগিয়ে রাখেন।

বিতর্কের মুখে আইএসউ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, “যেকোনো প্যানেলে বিভিন্ন বিচারকের বিভিন্ন স্কোর দেওয়া স্বাভাবিক। এই তারতম্য কমানোর জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। আইএসউ দেওয়া স্কোরে পূর্ণ আস্থা রাখে এবং ন্যায়পরায়ণতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি অনেকে। চেঞ্জ ডট ওর্গে ইতিমধ্যে ১৪ হাজারের বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে এই স্কোরিং নিয়ে তদন্তের দাবিতে।

চক নিজেও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দাবি করেছেন। “দর্শকরা যেন বিচারকদের স্কোরিং বুঝতে পারেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি। “স্কেটারদের জন্যও জরুরি যে বিচারকরা যাচাই-বাছাই করা হোক, তাদেরও সেরাটা দিতে হবে। স্কেটাররা যখন সর্বোচ্চটা দেন, তখন বিচারকদেরও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।”

এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০০২ সালের সল্ট লেক সিটি অলিম্পিকের কুখ্যাত স্ক্যান্ডাল। সেবারও এক ফরাসি বিচারক মারি-রেন লে গউগনের বিরুদ্ধে ভোট বিক্রির অভিযোগ ওঠে। রুশ জুটি এলেনা বেরেজনায়া-অ্যান্টন সিখারুলিদজের পক্ষে রায় দিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে কানাডার জেমি সালে-ডেভিড পেলেটিয়েরকে স্বর্ণ দেওয়া হয়, যদিও রুশ জুটিও তাদের পদক ধরে রাখেন।

সেই ঘটনার পর আইএসউ ৬.০ বিচার ব্যবস্থা বাতিল করে বর্তমান সিস্টেম চালু করে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, নতুন ব্যবস্থাও যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়, এখনো বিচারকদের পক্ষপাতিত্বের সুযোগ রয়েছে।

বিতর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, চক-বেটস ও ফোর্নিয়ে বোদ্রি-সিজেরোন একই কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। মন্ট্রিয়ালের আইস অ্যাকাডেমিতে দুই জুটির কোচ মারি-ফ্রান্স দুব্রেই, প্যাট্রিস লজঁ ও রোমাঁ আগেনো।

সিজেরোন এর আগে গ্যাব্রিয়েলা পাপাদাকিসের সঙ্গে ২০২২ সালে অলিম্পিক স্বর্ণ জিতেছিলেন। পাপাদাকিস তাঁর স্মৃতিকথায় সিজেরোনকে “নিয়ন্ত্রণকারী ও হিসাবি” বলে অভিহিত করেছেন, যা সিজেরোন “মানহানির প্রচারণা” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, ফোর্নিয়ে বোদ্রির আগের পার্টনার নিকোলাজ সোরেনসেনের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল, যদিও পরে তা বাতিল হয়।

বেটস হতাশা সামলে বলেন, “জীবনে মাঝেমধ্যে মনে হয় সব ঠিকঠাক করলাম, কিন্তু ফল আসে না। এটাই জীবন, এটাই খেলা। বিচারকনির্ভর খেলা এটা। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—আমরা আমাদের সেরাটা দিয়েছি।”

চক অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “এখন মিষ্টি-তিক্ত অনুভূতি কাজ করছে। ১৫ বছর একসঙ্গে, প্রথম অলিম্পিক বিবাহিত দম্পতি হিসেবে—আমরা গর্বিত। কিন্তু সেই স্বর্ণপদকটা অধরাই রয়ে গেল।”

মেডেল সেরেমনিতে চক কিছুতেই চোখের পানি আটকাতে পারেননি। রূপা পদক গলায় দেওয়ার সময় তিনি ও বেটস কেউই সেই দিকে তাকাননি—তাঁদের চোখ ছিল শূন্যে, মন হয়তো সেই স্বর্ণজয়ী পারফরম্যান্সের কথাই ভাবছিল যা বিচারকদের কাছে যথেষ্ট হলো না।

 

*তথ্যসূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক, সিবিএস স্পোর্টস, এনবিসি নিউজ, এপি নিউজ*

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *