পেন্টাগনের গোপন অভিযানে অ্যানথ্রোপিকের ক্লড: প্রযুক্তি যুদ্ধের নতুন মাত্রা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের এক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছে—এমন একটি প্রতিবেদন ঘিরে প্রযুক্তি ও সামরিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অভিযানে ব্যবহৃত হয় এআই কোম্পানি Anthropic-এর তৈরি ‘Claude’ মডেল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী কারাকাসে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে লক্ষ্য করা হয়। সেখানে ভেনেজুয়েলা ও কিউবার কয়েকজন সেনা নিহত হন, তবে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হননি। পরে মাদুরোকে নিউইয়র্কে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

অভিযানে সরাসরি এআই কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে জানা গেছে, অ্যানথ্রোপিকের অংশীদার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Palantir Technologies-এর মাধ্যমে ক্লড মডেলটি ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে এ ধরনের এআই মডেল স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে।

অ্যানথ্রোপিক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের কোনো নির্দিষ্ট মডেল কোনো বিশেষ অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—সে বিষয়ে তারা মন্তব্য করবে না। তবে তারা বলেছে, যেকোনো ব্যবহার তাদের নীতিমালার মধ্যে থাকতে হবে।

এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। অ্যানথ্রোপিকের নীতিমালায় বলা আছে, তাদের এআই মডেল সহিংসতা সহজতর করা, অস্ত্র উন্নয়ন বা নজরদারির কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অথচ আলোচিত অভিযানে সামরিক হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “আমরা এমন এআই ব্যবহার করব না, যা যুদ্ধ করতে দেয় না।” এই মন্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সামরিক বাহিনী এমন এআই মডেল চাইছে যা যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি কার্যকর হবে।

বর্তমানে পেন্টাগন ওপেনএআই, গুগল ও এলন মাস্কের xAI–এর মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও উন্নত এআই মডেল চাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে গোপন সামরিক নেটওয়ার্কে এখন পর্যন্ত ক্লডই প্যালান্টিরের মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে।

পেন্টাগনের সঙ্গে অ্যানথ্রোপিকের প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের কারণে সেই চুক্তি বাতিলের ঝুঁকিতে আছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কোম্পানির ভেতরেও নীতিগত উদ্বেগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যানথ্রোপিক সম্প্রতি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পেয়েছে এবং তাদের মূল্যায়ন কয়েকশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তারা নিজেদের “নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক” এআই কোম্পানি হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু সামরিক ব্যবহারের অভিযোগ তাদের অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এই ঘটনা দেখাচ্ছে, বাণিজ্যিক এআই প্রযুক্তি এখন শুধু অফিস বা গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই। তা সরাসরি যুদ্ধ ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—

  • বেসরকারি এআই কোম্পানির নীতিমালা কি সামরিক চাহিদার সঙ্গে টিকে থাকতে পারবে?
  • যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের নৈতিক সীমা কোথায়?
  • এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে?

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এআই আরও শক্তিশালী হলে এ ধরনের বিতর্ক বাড়বে। কারণ প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, তার ব্যবহার নিয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নও তত জটিল হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে, এ ঘটনা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়—বরং এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ব্যবহার, নীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের আলোচনার সূচনা করেছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *