দ্বিতীয় সুযোগে বদলে যাওয়া জীবন: স্কুলে ফিরল ৬ লাখ ৯০ হাজার শিশু

বাংলাদেশ গত দুই দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে। ভর্তি হার বেড়েছে, মেয়েদের অংশগ্রহণে এসেছে সমতা। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে ছিল কঠিন এক বাস্তবতা—দারিদ্র্যের কারণে পাঁচ মিলিয়নের বেশি শিশু স্কুলের বাইরে ছিল। কেউ কখনও ভর্তি হতে পারেনি, কেউ মাঝপথে ঝরে পড়েছে।

এই শিশুদের জন্যই নেওয়া হয় “দ্বিতীয় সুযোগ” কর্মসূচি—ROSC II (Reaching Out-of-School Children) প্রকল্প। সরকারের বাস্তবায়নে এবং World Bank-এর সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্প ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিশুকে শিক্ষার আওতায় এনেছে। এদের অর্ধেকই ছিল মেয়ে, এবং ৮৭ শতাংশ শিশু এসেছে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবার থেকে।

রাজশাহীর নাটোর জেলার নাহিদ সরকার এখন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দারিদ্র্যের কারণে ২০১৪ সালে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ROSC II-এর ‘আনন্দ স্কুল’-এ ভর্তি হয়ে পাঁচ বছরের ত্বরিত কোর্স শেষ করে ২০১৮ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ৪.০৮ জিপিএ পায়। এখন তার স্বপ্ন পাইলট হওয়ার।

নাহিদের মতো হাজারো শিশুর জন্য আনন্দ স্কুল ছিল নতুন শুরুর জায়গা। ROSC II সাধারণ বিদ্যালয়ের চেয়ে ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়। যাদের বয়স সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় বেশি, তারাও এখানে সুযোগ পায়। সময়সূচি নমনীয় রাখা হয় যাতে শিশুরা পারিবারিক কাজের পাশাপাশি পড়তে পারে। একজন শিক্ষক একই শ্রেণিতে সব বিষয় পড়ান। শিক্ষার্থীদের পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। বই, খাতা, ইউনিফর্ম বিনামূল্যে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াত খরচও সহায়তা করা হয়।স্থানীয় কমিউনিটি নিজেই স্কুল পরিচালনা ও তদারকি করে। কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটির ৯০ শতাংশ সদস্য নারী, যা গ্রামীণ নারীদের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রথমে গ্রামভিত্তিক হলেও পরে প্রকল্পটি শহরের বস্তিতেও চালু হয়। ২০১৭ সাল থেকে ১১টি সিটি কর্পোরেশনের বস্তিতে প্রায় ৪৮ হাজার শিশু শিক্ষার সুযোগ পায়। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যও শিক্ষা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়। প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার রোহিঙ্গা শিশু শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়। কক্সবাজারের ১ হাজার ৩৩১টি লার্নিং সেন্টারে প্রায় ৩ লাখ শিশু মনোসামাজিক সহায়তা পায়।

শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য পূর্ব-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়। ২৫ হাজার তরুণ-তরুণী দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পায়। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ চাকরি পেয়েছে বা ছোট ব্যবসা শুরু করেছে। কক্সবাজারে ১৬ হাজার ৫০০ তরুণ কর্মসংস্থান সহায়তা পেয়েছে। এই প্রকল্পে ৮০ শতাংশ শিক্ষক ছিলেন নারী। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির ৯০ শতাংশ প্রধানও নারী। ফলে গ্রামীণ নারীরা নেতৃত্বের সুযোগ পেয়েছেন। অনেক মা প্রথমবারের মতো সন্তানের শিক্ষায় সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

ROSC II-এর শিক্ষার্থীদের পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে যা বেড়ে ৮৭ শতাংশে পৌঁছায়। উপস্থিতির হার ছিল ৮৬ শতাংশ। প্রায় ১৮ হাজার গ্রামীণ শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

২০২০ সালে প্রকল্পটি শেষ হলেও এর মডেল এখন সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP 4)-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে দরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতি মূলধারায় জায়গা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ দেখিয়েছে—সঠিক পরিকল্পনা, আর্থিক সহায়তা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ থাকলে স্কুলের বাইরে থাকা শিশুরাও আবার শিক্ষায় ফিরতে পারে।

একটি সুযোগ অনেক সময় একটি জীবন বদলে দেয়। বাংলাদেশের “দ্বিতীয় সুযোগ” কর্মসূচি তারই প্রমাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *